রাতে প্যারিসের মতো ঝলমল করে ভারতের যে শহর

ভারতের অন্যতম শহর কলকাতা। শহরের নানা দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের ভবন। যেমন: জেনারেল পোস্ট অফিস এবং প্রাক্তন ব্রিটিশ ভাইসরয়ের প্রাসাদ, হিন্দু ও জৈন মন্দির, গ্রিক অর্থোডক্স ও পর্তুগিজ চার্চ,একটি অ্যাংলিকান ক্যাথেড্রাল, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বাসভবন এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাড়ি। তবে শহরের প্রধান আকর্ষণ শুধু ইতিহাস বা স্থাপত্য নয়, বরং আলো-যা সূর্যাস্তের পরে ভবনগুলোকে আলোকিত করে। ঠিক প্যারিসের মতোই। 

আসলে এই দর্শনীয় স্থানগুলোকে আলোকিত করা হচ্ছে কলকাতা ইলুমিনেশন প্রজেক্টের মাধ্যমে। এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা এক নাগরিক দল-কলকাতা রেস্টোরারস। এর মূল উদ্যোক্তা মুদার পাথেরিয়া। একদল বন্ধু ও পরিচিতজনদের অনুদানে এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।

দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ ও মিনারসহ বোহরা মুসলিমদের জন্য শহরের অন্যতম প্রধান বুরহানি মসজিদ। ছবি: মুদার পাথেরিয়া।

পাথেরিয়া বলেন, ‘এটি কোনও সংগঠন নয়। কোনও কমিটি নেই, কোনও সভাপতি নেই। এটি কেবল একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।’

প্রকল্পের শুরুটা হয়েছিল একটি পুরোনো মার্কেট ভবনের গম্বুজে রং করার ইচ্ছা থেকে। পরে দেখা যায়, দিনের আলোয় সেই সৌন্দর্য দেখা গেলেও রাতে তা হারিয়ে যায়। এরপরই সিদ্ধান্ত হয় আলোকসজ্জার।

এটি শেষ হওয়ার পর, কিছু অতিরিক্ত অর্থ থাকায় তিনি উত্তর কলকাতার এক পুরোনো মন্দিরও আলোকিত করেন। এতে সূক্ষ্ম খোদাই করা পাথরের মুখচ্ছবি নরম হলুদ আলোয় এমনভাবে ফুটে উঠল যা রোদের তীব্রতায় সম্ভব নয়।

উত্তর কলকাতার কালাচাঁদ মন্দির। ছবি: মুদার পাথেরিয়া।

এরপর কিছুদিনের মধ্যে তিনি ভারতের ভূতাত্ত্বিক জরিপ ভবন এবং পরবর্তীতে রাজভবনও আলোকিত করার অনুমতি পেলেন।

গত ২১ মাসে এরই মধ্যে ৯২টি ভবন আলোকিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক রাজ ভবন, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া, হগ মার্কেট, বিভিন্ন গির্জা, মন্দির ও চত্বর।

পাথেরিয়া বলেন, আলোর মাত্রা ঠিক করা সহজ ছিল না। লাইটিং ডিজাইনার সুশয নারসারিয়া জানান, ‘আমরা ওয়াট কমিয়েছি যাতে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। অবস্থান পরিবর্তন করেছি, স্তরভেদে আলো বসিয়েছি যাতে স্তম্ভ, রেলিং ও দেয়ালের নকশা ফুটে ওঠে।’

তবে আলোকসজ্জার সঙ্গে আরও একটি চ্যালেঞ্জ সামনে আসে—ভবনগুলো প্রায়ই জরাজীর্ণ ছিল এবং আলো সেটি আরও স্পষ্ট করে তুলতো। তাই আলোকিত করার আগে তাদের সংস্কার প্রয়োজন হতো।

২০ শতকের শুরুর দিকে এক আর্মেনীয় নির্মাতার নির্মিত কুইন্স ম্যানশন। ছবি: মুদার পাথেরিয়া।

যেমন: ১৫০ বছরের পুরোনো হগ মার্কেট। এর ঘড়ি বহুদিন ধরে নষ্ট, ছাদ ফুঁটে গেছে, মেঝের কাঠ পচে গেছে। তাই আগে মেরামত প্রয়োজন।

সৌভাগ্যক্রমে তিনি পেলেন চতুর্থ প্রজন্মের  ঘড়ি মেরামতের কারিগর স্বপন দত্তকে। তিনি ইতোমধ্যেই চার্চ, সিনাগগ এবং মার্কেটের অর্ধডজনেরও বেশি ঘড়ি ঠিক করেছেন।

এটি শুধু এক ধরনের শহর আলোকসজ্জা প্রকল্প নয়। ‘কলকাতা রিস্টোরারস’-এর মূল উদ্দেশ্য হলো শহরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও গর্ব ফিরিয়ে আনা।

কলকাতার ঔপনিবেশিক যুগের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ ভবন-রাজভবন। ছবি: মুদার পাথেরিয়া।

এক সময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হলেও স্বাধীনতার পর থেকে শহরের জৌলুস কমেছে। লেখিকা হিমানজলি শঙ্কর বলেন, আমরা প্রায়ই বলি কলকাতা সময়ের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। কিন্তু এসব আলো দেখিয়ে দেয়, কেউ কেউ এখনও শহরটাকে ভালোবাসে ও তার ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে চায়।

পাথেরিয়া বলেন, ব্যবসা আকর্ষণে ব্যস্ত শহরে ঐতিহ্যকে প্রায়ই ব্যয়বহুল বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। শহরের একটি অভিজাত কমপ্লেক্সে অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে প্রায় ১৫ কোটি রুপি খরচ হয়। কিন্তু মাত্র ২.২ কোটি রুপিতে আমরা ৯২টি ভবন, আট-নয়টি ঘড়ি এবং প্রায় ১ হাজার ৩০০টি সমাধিফলক পুনর্নির্মাণ করেছি।

তার লক্ষ্য ২০০ ভবন আলোকিত করা। তাহলেই এটি দেশের অন্যতম বিস্ময়কর রাতের শহর হয়ে উঠবে।

সূত্র: বিবিসি