বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এবং ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কূটনৈতিক সম্পাদক শুভজিৎ রায়ের কাছে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারের সম্পাদিত অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাদের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে অস্থিরতার ইতিহাস রয়েছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের আমলের দুই বছরকে ‘বিপর্যয়কর’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ওই সময়ে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলন দখল করে নেওয়া জামায়াতে ইসলামীর কথামতো তিনি চলছিলেন। আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেওয়ায় সেই নির্বাচনও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় এই সরকার প্রচুর চাপের মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, রান্নার গ্যাস ও জ্বালানিরও সংকট দেখা দিয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত থাকা একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ নিয়ে ঢাকায় বেশ তীব্র আলোচনা হয়েছে। তার ধারণা, ভারতবিরোধী লবি জয়ী হওয়ায় তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে ভারত সফর করা থেকে বিরত থেকেছেন। তবে অভিন্ন সভ্যতার অংশীদার হওয়ায় বাংলাদেশ চাইলেই ভারতকে পাশ কাটাতে পারবে না কিংবা অন্য কোনও দেশ দিয়ে তা পূরণ করতে পারবে না। লাখ লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারতে আসে এবং দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ও যোগাযোগ রয়েছে।
ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারতের নীতি হলো- ক্ষমতায় যেই সরকার থাকুক না কেন, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখা। সামরিক এখতিয়ারভুক্ত শাসক, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নির্বাচিত সরকার- সবার সঙ্গেই ভারত কাজ করেছে। মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার মতো স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো ভারত বন্ধ করবে না।
শেখ হাসিনাকে কেন ভারত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের ভালো সম্পর্ক ছিল। হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় না দেওয়ার কোনও কারণ ভারতের ছিল না। এমনকি বিএনপির এক প্রবীণ নেতা তথা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও বলেছেন যে দিল্লিতে হাসিনার অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলা উচিত নয়। তবে কিছু লবি ভারতকে হাসিনাকে হস্তান্তর করার দাবি তুলছে। বাংলাদেশ কয়েকটি অনুরোধ জানালেও প্রত্যর্পণ একটি বিচারিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ সরকার এখনও তা শুরু করেনি। হাসিনা যদি ফিরে যেতে চান, তবে ভারত তাকে বাধা দেবে না। তবে তিনি দেশে ফিরলে তার সঙ্গে কী আচরণ করা হবে, তা জানতে চাইবে ভারত। কারণ জামায়াতের মতো গোষ্ঠীগুলো তাকে দেশে পৌঁছামাত্র হত্যা করতে চায়।
হাসিনার ৫ আগস্টের বক্তব্য তারেক রহমানের সফরকে বাধাগ্রস্ত করেছে কি না, সে বিষয়ে এ কূটনীতিক বলেন, ভারত সরকার তাকে পরামর্শ দিতে পারতো। কিন্তু বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কাউকে কি কথা বলা থেকে আটকানো যায়? তাকে তো আমরা কোনও বন্দিশালায় রাখিনি। তিনি নিজ ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।
সম্পর্ক কি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, এটি অবশ্যই সম্ভব, তবে তালি দুই হাতে বাজে। ভারত যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখিয়েছে, এখন বল ঢাকার কোর্টে। তারা যদি সম্পর্ক নিম্ন পর্যায়ে রাখতে চায়, তবে তাই হবে। তবে ভারতের মূল নজর থাকবে সম্পর্কের মৌলিক স্তম্ভগুলোর ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা অর্থনীতি, আর সাধ্যমতো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দিয়ে ভারতকে তা সহায়তার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক নিয়ে তিনি বলেন, বড় সংখ্যক ইসলামপন্থি ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া এবং তাদের পুনর্গঠিত হওয়াটা উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশে আল-কায়েদার পুনরুত্থানের বিষয়ে জাতিসংঘও রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। শেখ হাসিনা উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ করলেও তার পুনরুত্থান ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই তা ভারতেও ছড়িয়ে পড়বে এবং পাকিস্তান তার সুযোগ নেবে।
নদী চুক্তির বিষয়ে তিনি জানান, ৫৪টি নদীর মধ্যে মাত্র একটি চুক্তি (গঙ্গা চুক্তি) রয়েছে যা ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি। তাৎক্ষণিক ইস্যু হলো গঙ্গা পানি চুক্তি। সেখানে দরকষাকষি কঠিন হবে, কারণ বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা চাইতে পারে যা ভারতের জন্য কঠিন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ সঙ্কোচনের কারণে মাথাপিছু পানির লভ্যতাপ্রাপ্তি কমছে এবং চাহিদা বাড়ছে।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালের আগ পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সামরিক বাহিনীকে বিনামূল্যে অস্ত্র দিয়ে তারা প্রভাব বিস্তার শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সামরিক সরঞ্জাম চীন থেকে আসে এবং দেশটি বিআরআই-এর মাধ্যমে কৌশলগত অবস্থান তৈরি করতে চায়। এছাড়া চীন বঙ্গোপসাগরে একটি করিডোর চায়, যার জন্য তারা মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে বিবেচনায় রাখছে। আর যুক্তরাষ্ট্র চায় না সেটি বাস্তবায়িত হোক। অন্যদিকে পাকিস্তানের একমাত্র বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য হলো ভারতবিরোধী অবস্থান এবং তারা বাংলাদেশকে নিজেদের পক্ষে টানতে চায়, যদিও বাংলাদেশ সেই ফাঁদে পা দেবে না বলে তার বিশ্বাস।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস