ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের কারণে দৃশ্যত থমকে গেছে। শনিবার মধ্য দিল্লির সবকটি পথই একপ্রকার জনমানবহীন হয়ে পড়ে; পুরো এলাকা জুড়ে কেবল পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
গত ৪৮ ঘণ্টার নজিরবিহীন গ্রেফতার এবং দিল্লির সীমান্তে যানবাহন চেকিংয়ের কারণে যে অল্প কয়েকজন বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তারাও নিরাপত্তা বাহিনীর বিশাল বেষ্টনীর মুখে পড়েন।
গত জুলাই মাসের প্রশ্নফাঁস আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকার আগেভাগেই পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে। সেই সময় আগাম গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল বলে মনে করা হলেও, এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
১০ অক্টোবরের এই আন্দোলনকে ঘিরে সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেস (সিএপিএফ)-এর প্রায় ২২১টি কোম্পানি যার সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৩,০০০- দিল্লি জুড়ে মোতায়েন করা হয়। জম্মু-কাশ্মীর ও ছত্তিশগড় থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী আনা হয়েছিল। এই মোতায়েন জুলাই মাসের আন্দোলন এমনকি ২০২০-২১ সালের কৃষক আন্দোলনের চেয়েও বড় ছিল।
যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া সব রাস্তা ধাতব শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা মাল্টি-লেয়ার ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যন্তর মন্তরের দুই কিলোমিটার পরিধির মধ্যে ৩৭টি পয়েন্টে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং সড়কগুলোতে স্পাইক স্ট্রিপ বা কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকায় কেন্দ্রীয় দিল্লি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। পশ্চিম দিল্লির দিক থেকে সচল থাকা নিকটবর্তী প্যাটেল নগর মেট্রো স্টেশন থেকে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা হেঁটে যেতে হচ্ছিল। পূর্ব দিল্লির দিকেও একই চিত্র দেখা গেছে। যমুনা ব্যাংক মেট্রো স্টেশনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। যাত্রী বহনকারী যেকোনও গাড়ি ও বাস থামিয়ে তাদের গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ঘটনাস্থলে দেখা যায়, প্রতিটি একক বিক্ষোভকারীকে ঘিরে ধরেছিলো ছয় থেকে আটজন করে নিরাপত্তা কর্মী এবং সেখান থেকে তাদের টেনে নিয়ে পুলিশ বাসে তোলা হচ্ছিলো।
ব্যাপক ধরপাকড়ে কী ভেস্তে গেলো আন্দোলন?
প্রশাসন ও পুলিশের এই ব্যাপক অভিযানের মুখে আন্দোলনটি গতি হারাতে বাধ্য হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৩,০০০ সন্দেহভাজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়, যদিও সিজেপির দাবি এই সংখ্যা ১০,০০০-এরও বেশি।
শনিবার সকালে গুড়গাঁওয়ের নিজ বাসভবন থেকে ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে আটক করা হয়। সিজেপির আইনি দলের প্রধান রত্না সিং অভিযোগ করেন, ২৫ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য তার গাড়ি ঘিরে ধরে তাকে ও তার তিন সহকর্মীকে আটক করে।
অন্যদিকে সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা- অভিজিৎ দিপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা মুম্বাই থেকে বিমানে দিল্লিতে পৌঁছালে ইন্দ্রিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানের ভেতর থেকেই নারী পুলিশ সদস্যরা তাদের আটক করেন। বিমানটির সংকুচিত স্থানে পুরুষ পুলিশ মোতায়েন করলে অপ্রীতিকর সংঘাত হতে পারে এমন আশঙ্কায় নারী পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আটকের পর তিন নেতাকে পৃথক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
দিল্লির বাইরেও এই অভিযান ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার গোয়া এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে পুণে থেকে আসা ১৪ জন ছাত্রকে মধ্যপ্রদেশের ইটারসি স্টেশনে নামিয়ে আটক করা হয়। এছাড়া তেলেঙ্গানা থেকে আসা সিজেপির একটি স্বেচ্ছাসেবক দলকেও ভোপাল রেলওয়ে স্টেশন থেকে আটক করা হয়।
সব মিলিয়ে, শুক্রবার রাত থেকে নজিরবিহীন বিধিনিষেধ ও গ্রেফতারের কারণে জুলাই মাসের মতো কোনও বড় ধরনের বিক্ষোভ গড়ে ওঠার আগেই যন্তর মন্তর ২.০ কর্মসূচি ভেস্তে যায়।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে