‘বাংলাদেশ পথ দেখিয়েছে’: ভারতেও সরকার পরিবর্তনের পথ দেখছে বিজেপি

‘বাংলাদেশ আমাদের পথ দেখিয়েছে’- দিল্লির ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দাবি করেছে, ভারতে ‘সরকার পরিবর্তনের’ বা রেজিম চেঞ্জের ষড়যন্ত্র প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কথিত নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে চলমান আন্দোলনের মধ্যে ২৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা এই মন্তব্য করেন। নেহা বোরা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড এস্টেটিক্স’-এ ডক্টরেট করছেন।

বিজেপি নেতা প্রদীপ ভাণ্ডারির শেয়ার করা একটি তারিখবিহীন সাক্ষাৎকার ক্লিপে নেহা বোরাকে বলতে শোনা যায়, ভারতে বর্তমানে যে ‘জেন জি’ আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তার সূচনা হয়েছিল কৌশলগত অংশীদার ও সীমান্ত সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে।

ক্লিপটিতে বোরাকে বলতে শোনা যায়, ‘এই দেশে আমরা সর্বত্র যে জেন জি আন্দোলন দেখছি, তা প্রথমে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল। আমাদের পথ দেখানোর জন্য এবং এই দেশের তরুণদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি’।

উল্লেখ্য টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র নেতৃত্বাধীন তীব্র আন্দোলনের মুখে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাটকীয় পতন ঘটে।

ভিডিওতে বোরা আরও উল্লেখ করেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগে প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতও এখন বাংলাদেশের মতো ‘গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার’ পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের জন্য। আজ দেশের তরুণরা যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে এবং নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেটাও গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের আন্দোলন’। 

তিনি আরও যোগ করেন, আপনারা আপনাদের দেশে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই করছেন, আজকের জেন জি ও তরুণরাও ভারতে সেই একই লড়াই করছে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আশা প্রকাশ করেন, একটি উন্নত দক্ষিণ এশিয়া ও উন্নত বিশ্বের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের তরুণরা একসঙ্গে লড়াই করতে পারে।

এই ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করেই বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি দাবি করেছেন, এটি ভারতে সরকার পরিবর্তনের এক ‘খোলামেলা স্বীকারোক্তি’।

ভিডিওতে বেশ চিৎকার করে প্রদীপ ভাণ্ডারি দাবি করেন, রাহুল গান্ধী এবং তার পুরো ইকোসিস্টেম কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে চায় না; তারা সরকার পরিবর্তন চায়। নেহা বোরা এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি বাংলাদেশের জেন জি আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং বাংলাদেশে যা ঘটেছে তারা ভারতেও তার পুনরাবৃত্তি করতে চায়।

বিজেপির সাবেক এই সাংবাদিক আরও বলেন, এটি প্রমাণ করে রাহুল গান্ধীর উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়; বরং তার লক্ষ্য ভারতের সংবিধান ও গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা। এতে স্পষ্ট যে পুরো কংগ্রেস ইকোসিস্টেম শুধুমাত্র ভারতীয় গণতন্ত্রকে চূর্ণ করা এবং বাংলাদেশে যা ঘটেছে তার মতো সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রে মনোযোগ দিচ্ছে। রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস ইকোসিস্টেম ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য বিপদ।

এদিকে, চলতি সপ্তাহে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া ব্লক’ নেতাদের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রায় যোগ দেন নেহা বোরা। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী সমস্ত আন্দোলনকে আলাদা করতে অস্বীকার করে একে ‘একটি আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাহুল গান্ধী বলেন, ‘সব আন্দোলনই মূলত একটি আন্দোলন। ভারত এগিয়ে চলেছে। আপনি কে বা কোন দলের থেকে এসেছেন তা আমাদের দেখার বিষয় নয়; আপনি যদি সংবিধান রক্ষা করেন, তবে আমরা আপনার সঙ্গে আছি, সাহায্য করব ও সুরক্ষা দেব। এটি ভারতের মানুষের প্রতি আমাদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ’।

ব্যক্তিগত আলাপে মৃদুভাষী হলেও মাইকের সামনে অত্যন্ত প্রভাবশালী বক্তা হিসেবে পরিচিত নেহা বোরা হিন্দি ও ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি প্রায়ই সাংবিধানিক অধিকারের কথা তুলে ধরেন এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে সরকারি জবাবদিহিতা ও বৈষম্যের মতো বড় ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করেন।

চলতি বছরের জুলাই মাসে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আয়োজিত বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে প্রথম ব্যাপক আলোচনায় আসেন নেহা বোরা। ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে পুলিশি পদক্ষেপ ও সরকারের সমালোচনা করে দেওয়া তার বক্তব্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে রাজধানীতে সব ধরনের বিক্ষোভে তিনি এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকালে একাধিকবার আটক হলেও মুক্তি পেয়ে তিনি বারবার রাজপথে ফিরে এসেছেন।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা বলেন, শুধু আদর্শ দিয়ে এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে না, বরং ‘আশা’ হলো এর বড় চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, ‘ভয় সংক্রামক, তবে আশাও সংক্রামক’। মানুষের এখন সাহস আছে কারণ তারা মনে করে যে তারা সাহসী হতে পারে। বর্তমান এই বিক্ষোভ বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্র: এনডিটিভি