ভারত ‘সন্ত্রাসবাদ রফতানি’ করছে, অভিযোগ পাকিস্তানি পরমাণু উপদেষ্টার

তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মতো সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে সমর্থন দিয়ে ভারত সন্ত্রাসবাদে ইন্ধন যোগাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ পরমাণু অস্ত্র উপদেষ্টা।

পাকিস্তানের ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির (এনসিএ) উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাযহার জামিল অভিযোগ করে বলেন, ভারত নীতিগত কৌশল হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ রফতানি’ করছে এবং নীতি অনুযায়ী পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরি করতে প্রকাশ্যে ‘ডোভাল ডকট্রিন’ বাস্তবায়ন করছে।

গত ১৩ অক্টোবর লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (আইআইএসএস) দেওয়া এক বক্তব্যে জামিল এই মন্তব্য করেন। ভারতের অতীতে সন্ত্রাসবাদে কথিত সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তিনি ১৯৮০-এর দশকে এলটিটিই এবং আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহায়তা চলাকালে (২০০১-১৪) আফগান-পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের ছয়টি কনস্যুলেট পরিচালনার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

‘দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে পরমাণু প্রতিরোধ ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ শীর্ষক ট্র্যাক ১.৫ কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, নানা দাবি এবং অর্ধ-সত্যে ভরা এই বক্তব্যে জামিল অভিযোগ করেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে ভারত ‘দ্বৈত-ক্ষমতাসম্পন্ন’ ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল- যার অর্থ ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পারমাণবিক অস্ত্র পরিচালনাকারী ইউনিট স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের (এসপিডি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জামিল অভিযোগ করেন, গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে ভারত দক্ষিণ এশিয়াকে ‘পরমাণু বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে’ নিয়ে গিয়েছিল। তিনি দাবি করেন, ‘শুধুমাত্র পাকিস্তানের কৌশলগত সংযমের কারণেই’ সে সময় পরিস্থিতি রক্ষা পেয়েছিল। 

সুইডিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক এসআইপিআরআই-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে জামিল দাবি করেন, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে ভারত ‘ফার্স্ট-স্ট্রাইক সক্ষমতা’ বা প্রথমে পরমাণু হামলার ক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে। তিনি জানান, ভারত তাদের কিছু পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সাথে যুক্ত করেছে এবং সমুদ্রে টহল পরিচালনা করেছে, যা বিভ্রান্তি ও ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উল্লেখ্য ১৯৯৯ সালে ভারতের প্রকাশিত খসড়া পারমাণবিক নীতিমালায় প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালানোকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে ‘প্রয়োজনীয় নূন্যতম পরমাণু প্রতিরোধ’ এবং ‘কেবলমাত্র পাল্টা আক্রমণ’ বা যাকে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ (এনএফইউ) বলা হয়-  তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে জামিল ভারতের ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতিকে একটি ‘কূটনৈতিক চাল’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, ভারতের পরমাণু নীতির অন্যতম রূপকার ও সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন অন-রেকর্ড বলেছেন যে ‘ভারতের পারমাণবিক নীতিতে প্রথম আঘাত বা ফার্স্ট-স্ট্রাইকের বিকল্প যুক্ত করার মতো নমনীয়তা রয়েছে’। 

এছাড়া ২০২২ সালে ভারতীয় বিমানবাহিনী থেকে দুর্ঘটনাবশত উৎক্ষেপণ হওয়া একটি ব্রাহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রকে জামিল ‘পাকিস্তানের ওপর ইচ্ছাকৃত ব্রাহ্মোস হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ২০২২ সালের মার্চে একটি মহড়ার সময় দুর্ঘটনাবশত উৎক্ষেপিত সেই ক্ষেপণাস্ত্রটি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের খানেওয়াল জেলায় গিয়ে পড়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাগলে পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অংশীদার তুরস্ক ও সৌদি আরব সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন এড়িয়ে যান জামিল। তিনি মক্কা চুক্তিকে ‘সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক’ বলে অভিহিত করেন।

উল্লেখ্য জামিল যে এনসিএ-এর উপদেষ্টা, তার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। এনসিএ ছিল পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র তদারকির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, তবে গত নভেম্বরে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড গঠনের মাধ্যমে সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্র ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অধীনে আনা হয়। এর ফলে সামরিক বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত অস্ত্র থাকা বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পাকিস্তান। 

সূত্র: দ্য ডন, ইন্ডিয়া টুডে