ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তজুড়ে চীন ও ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে ভারত। ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি)-এর মহাপরিচালক শত্রুজীত কাপুর বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জানিয়েছেন, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে একাধিক স্থানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি এখনও অব্যাহত রয়েছে।
রাজস্থানের আলোয়ারে আইটিবিপির সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজে আয়োজিত বার্ষিক সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান ‘হিমবীর সম্মান সমারোহ’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় কাপুর জানান, আইটিবিপির কমান্ডোরা বর্তমানে এই সীমান্ত উত্তেজনার মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন।
তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে অরুণাচলের বেশ কয়েকটি স্থানে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। আমাদের সদ্য গঠিত ‘শৌর্য’ কমান্ডোরা এতে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করেছেন।
মহাপরিচালক কাপুর আরও জানান, আইটিবিপি মূলত পাহাড়ি গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং ২০০৪ সালে এদের চীন সীমান্তে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বাহিনীটি তাদের মূল ভূমিকা থেকে সরে আসবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর বাইরে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধের জন্য বিশেষায়িত একটি ইউনিট গড়ে তোলা হচ্ছে। শিগগিরই ‘শৌর্য’ কমান্ডোদের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন গঠন করা হবে। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনই এই বাহিনীর শক্তি।
চীন সীমান্তে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করছে ভারত
আইটিবিপি প্রধান জানান, আগামী তিন বছরের মধ্যে চীন সীমান্তে যতগুলো উপরিভাগের বা ওভারগ্রাউন্ড অবকাঠামো রয়েছে, ঠিক ততসংখ্যক ভূগর্ভস্থ বা আন্ডারগ্রাউন্ড আশ্রয়কেন্দ্র বা শেল্টার তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটির ওপরের যেকোনও স্থাপনাই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাই ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানিতে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু রয়েছে, যার লক্ষ্য হলো পর্যাপ্ত বাথরুম, বায়ু চলাচল ও ড্রেনেজ সুবিধাসহ সুবিধাজনক স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করা। নকশা চূড়ান্ত হলে আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রতিটি বর্ডার আউটপোস্টে সমসংখ্যক ভূগর্ভস্থ ও মাটির ওপরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
তাকসিংয়ের কাছে চীনের তাঁবু?
সরকারি সূত্রের বরাতে ভারতের বার্তা সংস্থা দ্য হিন্দু জানিয়েছে, গত জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবানসিরি জেলার তাকসিং সার্কেলের ‘মাজা কোম্পানি অপারেটিং বেস’-এর কাছে ‘আসাফিলা’ এলাকায় ভারত ও চীন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) নিয়ে ভারতের ধারণার ৬ থেকে ৭ কিলোমিটারের মধ্যে একটি উচ্চতায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) তাঁবু খাটিয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, জুলাই মাসে নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় মাজার কাছে ভারত ও চীনের সেনারা মুখোমুখি হন। সংক্ষিপ্ত তর্কের পর উভয় পক্ষই পিছু হটলেও কয়েক দিন পর চীন বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়ে ফিরে আসে এবং তাঁবু স্থাপন করে। এর জবাবে ভারতও সেখানে তাদের সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করেছে।
কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও এই সীমান্ত অচলাবস্থা বজায় রয়েছে। গত ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এছাড়া গত জুলাই থেকে দুই দেশের মধ্যে তিনটি উচ্চপর্যায়ের সীমান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬ আগস্ট ৩৬তম ডব্লিউএমসিসি বৈঠক, ২৬ আগস্ট বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের উপস্থিতিতে ২৫তম বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক এবং ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের বাচা-দামাই পয়েন্টে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ইস্টার্ন সেক্টরের কর্পস কমান্ডার স্তরের বৈঠক। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে এ ধরনের বৈঠকগুলো প্রধানত পূর্ব লাদাখের চুসুল-মোলদো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিলো।
সূত্র: উইয়ন নিউজ