নয়ডার ফুড কার্টে ‘লাহাম’ এখন নতুন আকর্ষণ

শনিবার রাতে প্রায় তিন ঘণ্টা ফুড কার্টে দাঁড়িয়ে থাকার পর সাক্ষাৎকারে বসলেন ২৬ বছর বয়সী এক প্রযুক্তিকর্মী। সেটি ছিল মিষ্টি-তেতো এক রাত। তার একমাত্র পদ নামকিন গোশত ওই সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, ফলে অনেক ক্রেতাকে খালি হাতে ফিরতে হয়। খাবার ফুরিয়ে গেছে জেনে এক ছোট ছেলে কান্নার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।

এ গল্প লাহাম-এর। দুই প্রোডাক্ট ম্যানেজার ঋষভ কুমার ও শশীকান্ত সিং এ ফুড কার্ট শুরু করেছেন। নয়ডার একটি বাজারের গলিতে কার্টটি আসার কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় রাতারাতি খ্যাতি পায়। সপ্তাহের পাঁচ দিন তারা কর্পোরেট চাকরি করেন, আর সপ্তাহান্ত দেন কার্টকে।

কুমার জানান, নয়ডার রাস্তার খাবারের জগতে লিট্টি চোখা থেকে সুশি সবই আছে, কিন্তু লাহাম আলাদা। এখানে পদ মাত্র একটি, মালাবার কয়েন পরোটার ওপর সাজানো নামকিন গোশত। তিনটি আকারে মেলে। অর্ধেক (দুই টুকরো পরোটা) ১৫৯ রুপি, পূর্ণ (চার টুকরো) ২৭৯ রুপি এবং বড় (ছয় টুকরো) ৩৯৯ রুপি। মূল পদ ফুরিয়ে গেলে ক্রেতাদের জন্য কিমা মাটনের গ্রেভির বিকল্পও থাকে।

লাহাম আরবি শব্দ, অর্থ মাংস। পদটির অনুপ্রেরণা পাকিস্তানের পেশোয়ার ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার স্ট্রিট-স্টাইল মাংসের পদ লাহাম চারসি, যাতে মশলা খুব কম থাকে। কুমার প্রথম হায়দরাবাদে এটি খেয়েছিলেন। কার্টের প্রধান রাঁধুনিও তিনি। তার ভাষায়, ধারণাটি হলো পূর্ণাঙ্গ খাবার, তবে ছোট ছোট কামড়ে, যা রাস্তায় খাওয়া সহজ।

লাহাম ৫ সেপ্টেম্বর চালু হয়। কুমারের হিসাবে প্রথম মাসে আয় হয়েছে ৬ লাখ রুপি। এটি মুনাফা নয়। তিনি বলেন, ব্যবসা নিট মুনাফায় আছে, তবে প্রায় পুরোটাই আবার ব্যবসায় ঢালা হচ্ছে।

পাঁচ দিন ডেস্কে, দুই দিন কার্টে

দুজন বেঙ্গালুরুতে সহকর্মী ছিলেন এবং এ বছরের শুরুতে নয়ডায় আসেন। কাজ ভাগ করা আছে। কুমার দেখেন পণ্য, রান্না, বিপণন ও কনটেন্ট। শশীকান্ত দেখেন অর্থ, পরিচালনা ও সংগ্রহ। শুক্রবার পরিকল্পনা ও কাঁচামাল সংগ্রহের দিন। তারপর শুরু হয় সপ্তাহান্ত।

কুমার হেসে বলেন, শনি-রবিবার আমরা ঘুমাই না। রাত ১১টা বা সাড়ে ১১টায় কার্ট বন্ধ করে সরঞ্জাম ক্লাউড কিচেনে ফেরাতে ফেরাতে রাত ২টা হয়। আবার সকাল ৭-৮টায় প্রস্তুতি শুরু। সহকর্মীরা জানেন এবং খুব গর্বিত। তবে নিয়োগকর্তার নাম প্রকাশ করতে চান না তিনি।

প্রায় নয় বছর ধরে রান্না করছেন কুমার, কিছুটা বাবা-মায়ের কাছে শিখেছেন, বাকিটা ইউটিউব ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। প্রোডাক্ট ম্যানেজার হয়ে খাবারের ব্যবসা কেন? তার উত্তর, ফ্যাশনে পুঁজি লাগে। খাবার ন্যূনতম বিনিয়োগে শুরু করা যায়। দুজন শুরু করেছিলেন ৩৫ হাজার রুপি দিয়ে। প্রথমে শশীকান্তের ভাড়া বাসায় রান্না হতো, বাড়িওয়ালার আপত্তিতে পরে ক্লাউড কিচেনে সরে যান। শ্রাবণ মাসে অনেক উত্তর ভারতীয় মাংস খান না, সেই সময় তাঁরা নকশা, লোগো ও রেসিপি চূড়ান্ত করেন।

২.৫ কেজি থেকে ২৫ কেজি

প্রথম দিন প্রথম ১০ মিনিট কেউ আসেননি। প্রথম ক্রেতা ছিলেন মাতাল, এক প্লেট খেয়ে পছন্দ হওয়ায় আরেকটি বড় প্লেট নেন। ওই দিন বিক্রি হয় ২৫ প্লেট, পরদিন ৩৫। শুরু হয়েছিল ২.৫ কেজি মাটন দিয়ে, এখন লাগে ২৫ কেজি। প্রতিটি উপকরণের পরিমাণ নির্দিষ্ট করায় স্বাদ একই থাকে বলে জানান কুমার।

একবার অনুমতি না থাকায় কার্ট বসানো গেল না, অথচ ২০ কেজি মাটন প্রস্তুত। তখন হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামে অর্ডার নিয়ে টেকঅ্যাওয়ে চালু করেন, সেদিনও সব বিক্রি হয়। পরে কার্ট একটি ব্যক্তিগত জায়গায় সরে যায়।

লাহাম আমন্ত্রণ পেয়েছে দিল্লির বড় ফুড ফেস্টিভ্যাল হর্ন ওকে প্লিজ এবং দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে। কুমারের বোন প্রিয়াঙ্কা রান্নাঘর সামলান, বন্ধু অর্পিত অপারেশন দেখেন, আরেক বন্ধু রচিত বিলিং করেন।

পাঁচ কোটি রুপি মূল্যায়নে এক কোটির শেয়ার কিনতে চেয়েছিলেন একজন। কুমার রাজি হননি, বলেন, বিনিয়োগ নয়, নিজেদের পুঁজিতেই এগোতে চান। তিন বছরের পরিকল্পনায় আছে একাধিক কার্ট, তারপর কিয়স্ক এবং শেষে ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁ। দিল্লি-এনসিআর ও নিজের শহর গোরখপুরে বিস্তারের পর শেষ লক্ষ্য মুম্বাই। তিন বছর দুজনের কেউ লাহাম থেকে কিছু নেবেন না।

সূত্র: এনডিটিভি