তুরস্কের সঙ্গে কাতারের কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ছে

সৌদি আরবের নেতৃত্বে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের কাতারের বিরুদ্ধে গত বছর জুনে অবরোধ আরোপের পর দেশটির পাশে দাঁড়িয়েছে পুরনো ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্ক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কারণেই উভয় দেশ দীর্ঘদিন ধরেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে আসছে। ২০১৫ সালে দুই দেশই এই সম্পর্ক জোরদারে সুপ্রিম স্ট্র্যাটেজিক কমিটি গঠন করে। দুই দেশের শীর্ষ নেতারা নিয়মিতই বৈঠকে বসেন। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে স্থানীয় পরাশক্তিগুলো অবরোধ জারি করলেও তুরস্ক সবসময় পাশে ছিল কাতারের। দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। এতে এই কৌশলগত সম্পর্কের বিস্তারিত উঠে এসেছে।

আঙ্কারায় তুর্কি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাতারি আমির

সামরিক সম্পর্ক

২০১৭ সালের ৫ জুন সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ এনে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও মিসরসহ কয়েকটি দেশ। এই সংকট শুরুর ‍দুইদিন পর তুরস্কের পার্লামেন্ট কাতারে তাদের সামরিক ঘাঁটিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।

অবরোধ জারিকৃত দেশগুলোর ১৩ দাবির মধ্যে একটি ছিল কাতার থেকে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার করা। তবে সেই পথে হাঁটেনি কাতার। ২০১৫ সালের ১৮ জুন তারিক ইবন জিয়াদ সামরিক ঘাঁটিতে প্রথমবারের মতো অবস্থান নেয় তুর্কি সেনারা। এতে করে কাতারের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। সন্ত্রাস দমন করে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আশা ব্যক্ত করেন উভয় দেশের নেতারা। চলতি বছর জানুয়ারিতে কাতারে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত বলেন,ভবিষ্যতে তারা কাতারে বিমান ও নৌবাহিনীও মোতায়েন করবে।  

খাদ্য নিরাপত্তা

উপসাগরীয় সংকট শুরু হলে কাতারের একমাত্র স্থলবন্দর বন্ধ করে দেয় সৌদি আরব। ফলে আমদানি বন্ধ হয়ে যায় দোহার। অনেক জরুরি খাদ্যও তখন কাতারে প্রবেশ করতে পারছিল না। অবরোধ জারির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কাতারে বিমানভর্তি দুধ, দই ও ডিম পাঠিয়েছিল তুরস্ক।  

অবরোধের চারমাসের মধ্যে কাতার ৯০ শতাংশ রফতানি বাড়িয়ে দেয়। কাতারের খাবার ও পানীয়ের দাম বেড়ে যায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ। স্থলবন্দর না থাকায় এই মূল্যবৃদ্ধি। হামাদ বন্দরে খাবার মজুদ ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে ৪৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে কাতার। 

তুরস্ক আশা করছে, অবরোধ থাকার পরও কাতারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকবে তাদের। অবরোধ উঠে গেলেও তাদের পণ্য সেখানে থাকবে বলে জানিয়েছেন তুর্কি কর্মকর্তা।

কাতারি বিনিয়োগ

অবরোধের আগে থেকেই কাতারের অর্থনীতিতে অনেক বিনিয়োগ ছিল তুরস্কের। গত বছর মে মাসে কাতারের চেম্বার অব কমার্সের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বিন তওয়ার বলেন, ‘তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলো কাতারে ১১.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর বেশিরভাগই ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপকেন্দ্রিক।

তুরস্কে কাতারের বিনিয়োগ ২ হাজার কোটি ডলারের মতো। কাতার ২০১৮ সালে আরও ১৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।    

-কমার্স

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কাতার পোস্ট চলতি বছরেই নতুন ই-কমার্স সাইট চালু করেছে। এটার সঙ্গে যুক্ত আছে তুরস্কের জেনারেল ডিরেক্টরেট পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ অর্গানাইজেশন।

এখন কাতারি জনগণ ঘরে বসেই তুর্কি পণ্যের অর্ডার দিতে পারবেন। এটা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।  কাতারের যোগাযোগ মন্ত্রী জসিম সাইফ আল সুলাইতি বলেন, অর্ডারের সাতদিনের মধ্যে পণ্য চলে আসবে।

উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়মিত বৈঠক

কাতার ও তুরস্কের পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদারে বরাবরই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করে আসছেন দুই দেশের নেতারা। চলতি বছর জানুয়ারিতেই কাতারের আমির তুর্কি প্রেসিডেন্ট এর সঙ্গে দেখা করেছেন। এর আগে গত বছর নভেম্বরে কাতারে এসেছিলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান।

২০১৭ সালের অক্টোবরে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি ও তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভোসোগলু আঙ্কারায় দেখা করেন।

এরও আগে সেপ্টেম্বরে আঙ্কারায় এরদোয়ানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন কাতারি আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি।