তুর্কিবিরোধী লড়াইয়ে কুর্দিদের গোপন সহযোগিতা আসাদের

 

সিরিয়ায় আফরিনে তুরস্কের সামরিক অভিযানের মুখে থাকা সিরীয় প্রেসিডেন্ট আসাদবিরোধী বিদ্রোহী কুর্দি সেনাদের সরাসরি সহায়তা করছে না সরকারি বাহিনী। তবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা দিয়ে কুর্দি যোদ্ধা, বেসামরিক নাগরিক ও রাজনীতিকদের অবাধে চলাফেরা করার সুযোগ দিচ্ছে। এমনকি সিরিয়ার ‍কুর্দি অধ্যুষিত অন্যান্য এলাকা থেকেও যোদ্ধাদের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সহায়তা করছে আসাদবাহিনী। অন্যদিকে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় রুশ সেনাদের সহায়তায় হামলা চালিয়েছে সরকারি বাহিনী। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এর ফলে বিরোধী শক্তি হলেও তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আসাদ গোপনে কুর্দিদের সহযোগিতা করছেন। এতে করে আরও জটিল মোড় নিচ্ছে সাত বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ।

কুর্দি যোদ্ধাদের ফাইল ছবি

সম্প্রতি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ বলেছেন, ‘আফরিনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তুরস্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কুর্দি যোদ্ধারা অপছন্দের একটি পক্ষের কাছ থেকে পরোক্ষ সহায়তা পাচ্ছে।’

কুর্দিদের স্বশাসনের দাবির বিরোধিতা করে সরকারি বাহিনী ও কুর্দি নেতৃত্বাধীন জোট সিরিয়াজুড়ে একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। কিন্তু তুরস্কের অভিযানের বিরুদ্ধে পারস্পারিক স্বার্থের কারণে তারা জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করছে।

সিরিয়ার আফরিনে কুর্দিদের ওয়াইপিজিকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তের জন্য হুমকি মনে করে তুরস্ক। একারণে তারা তিন সপ্তাহ আগে সেখানে অভিযান শুরু করে। ওই সময় কুর্দিরা দামেস্ককে তাদের সহায়তায় সেনা পাঠানোর অনুরোধ করেছিল। কিন্তু আসাদ তা করেননি। কিন্তু পরোক্ষভাবে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কুর্দিদের সহায়তা করছেন। এর মাধ্যমে আসাদ সামান্য কাজ করেই লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছেন। তুরস্কের অভিযানের মুখে রসদ সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় কুর্দিরা এখনও টিকে আছে।

এদিকে, আফরিন যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। কুর্দিরা আসাদ সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় যাওয়ার পাশাপাশি তাদের সঙ্গেও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক সুরক্ষা না পেয়ে কুর্দিরা দামেস্কর সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় কোবানি ও জাজিরাসহ অন্যান্য কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা থেকে আফরিনে রসদ পাঠানো নিশ্চিত করবে সরকারি বাহিনী। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সের (এসডিএফ) মুখপাত্র কিনো গ্রাবিয়েল বলেন, বিভিন্নভাবে আফরিনে রসদ সরবরাহ করা যায়। তবে সরকারি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকা দিয়েই প্রধান পথটি রয়েছে। আফরিনে রসদ সরবরাহের জন্য দুই বাহিনীর মধ্যে সমঝোতা হয়েছে।

আফরিনে পৌঁছানোর জন্য কুর্দিরা আসাদের উপর নির্ভর করলেও দামেস্কর ওপর চাপ প্রয়োগের উপায় খুঁজে পেয়েছেন। কারণ সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে খাদ্য ও তেল সংগ্রহের জন্য তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে আসাদকে।

তবে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে আসাদ বাহিনীর একজন কমান্ডার বলেছেন, সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করা ছাড়া কুর্দিদের আর কোনও উপায় নেই। নাম প্রকাশ না করে তিনি আরও বলেন, সিরিয়া সরকার চোখ বন্ধ করে কুর্দিদের মানবিক সহায়তাসহ আরও কিছু সহায়তা দিচ্ছে। একই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এভাবে সমর্থন করা হচ্ছে।   

অভিযান শুরু করলেও কুর্দিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তুরস্ক দ্রুত কোনও উন্নতি করতে পারছে না। আফরিন যুদ্ধ আসাদ সরকার ও কুর্দিদের জটিল সম্পর্কে নতুন চমক এনেছে। ওয়াইপিজি ২০১১ সালে গৃহযু্দ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে আসছে। আর আসাদ চান পুরো সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিতে। ওয়াইপিজি সিরিয়ার তুর্কি সীমান্তের প্রায় বেশিরভাগ অংশই নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু আফরিন অন্যান্য কুর্দি অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১১০ কিলোমিটার অঞ্চল আফরিন যুদ্ধে তুরস্কের পক্ষে থাকা বিদ্রোহী দলগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

একই শত্রুর বিরুদ্ধেও বেশিরভাগ যুদ্ধে কুর্দি ও সরকারি বাহিনী একে অপরকে এড়িয়ে চলেছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে কুর্দি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় সিরিয়ার পুর্ব ও উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকা দখল করে নিয়েছে। এতে সরকার তাদের হুমকি মনে করা শুরু করেছে। এ কারণে সরকার সমর্থিত বাহিনী পুর্বাঞ্চল প্রদেশের দেইর আল-জোর শহরে বিমান হামলা চালিয়ে এক রাতে শতাধিক কুর্দি যোদ্ধাকে হত্যা করে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক নোয়াহ বনসেই বলেন, ‘সরকার কুর্দিদের লোকবল আনতে দিচ্ছে আবার পূর্বাঞ্চলে হামলাও করছে। আমি মনে করি এটা সরকারের সঠিক সম্পর্কের বিষয়ে একটা ইঙ্গিত।’ তিনি আরও বলেন, উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকার ও কুর্দি বাহিনী একটি দৃশ্যমান দূরত্বে অবস্থান নিয়ে আছে।