জার্মানির মিউনিখে নিরাপত্তা সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর পর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল জুবায়েরও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। সে সময় জুবায়ের ‘ইরানের শাসন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন’ আনার দাবি জানান। তবে পাল্টা অভিযোগ করে ইরান বলেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দোসর রাষ্ট্র’ সৌদি আরব ও ইসরায়েল তাদের ‘নিম্নমানের পছন্দ’ ও ‘কৌশলগত ভুল’ ঢাকার চেষ্টা করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মেদ জাভেদ জারিফ তার বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যে তার দেশের নীতিকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর অভিযোগ করেন। এছাড়া অন্য কোনও দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও তাদের নেই বলে দাবি করেন তিনি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে সিরিয়ায় ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও সিরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর গুলিতে ইসরায়েলি যু্দ্ধ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এরপর থেকেই ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় মিউনিখ সম্মেলনে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ হাতে হাজির হন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি ইরানকে ‘বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে অ্যাখ্যা দেন। তবে তার বক্তব্যের পরই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ‘কার্টুনসুলভ সার্কাস’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। এরপর সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও ইরানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুবায়ের দাবি করেন, ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে অঞ্চলটিতে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিয়েছে ইরান। এই বিপ্লবের কারণেই হিজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠা হয়েছে জানিয়ে ইরানের নিন্দা করেন তিনি।
জুবায়ের বলেন, ‘আমরা ইরানে হামলা চালাইনি। ইরানই আমাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ইরান আফ্রিকার দেশগুলোসহ লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইন, ইয়েমেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ক্ষতি করে যাচ্ছে।’
ইসরায়েল ও সৌদি আরবের নেতাদের এমন বক্তব্যের পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের অঞ্চলে তাদের দোসর রাষ্ট্র নিজেদের ভুল পছন্দের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছে। কিন্তু এর দায় ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ওপর চাপিয়ে বাস্তবতাকে আড়াল করার কৌশল ব্যবহার করছে।’
জাফরির উল্লেখ করা ‘নিম্নমানের পছন্দে’র তালিকায় ৮০’র দশকে ইরাকের তৎকালীন নেতা সাদ্দাম হোসেনকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, ২০০৩ সালে তাকেই উৎখাত করতে মার্কিন হামলা, ফিলিস্তিনের ইসরায়েলের দখলদারি ও ইয়েমেনে সৌদি জোটের বিমান হামলা বিষয়গুলো রয়েছে।
জাফরি উপসাগরীয় অঞ্চলে সংলাপের ভিত্তিতে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, আমরা একটি শক্তিশালী অঞ্চল চাই। আমরা এই অঞ্চলে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাই না। এমন একটি শক্তিশালী অঞ্চল চাই যেখানে ছোট ও বড় জাতিসহ ঐতিহাসিক শত্রুরা পর্যন্ত স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আধিপত্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল আর ইরানের অবস্থান পরস্পরের বিপরীতে। সৌদি-ইসরায়েল মৈত্রী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির অনুসারী। বিপরীতে ইরানের অবস্থান মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে। সিরিয়ায় মার্কিন আধিপত্যের বিরোধী হওয়ার কারণেই ইরান সিরীয় যুদ্ধে আসাদ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইসরায়েল সবসময়ই তাদের ওপর ইরানি হামলার আশঙ্কার কথা প্রচার করে আসছে। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত যেকোনও সময় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দেন। ইসরায়েলের আশঙ্কা সিরিয়ার ভূমি ব্যবহার করে তাদের ওপর ইরান হামলা চালাতে পারে বা লেবাননের শিয়াপন্থী হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারে। সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধে ইরানের সম্পৃক্ততায় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বি সৌদি আরবও শংকিত।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেস ক্রিইগ বিষয়টি নিয়ে আল জাজিরাকে বলেন, ইরান বিরোধিতার কারণে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত জোট তৈরি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, এখন মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বিষয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে কোনও উত্তেজনা নেই। বরং ইরানের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যেই বেশি উত্তেজনা রয়েছে।
আন্দ্রেস আরও বলেন, সৌদি আরব এখন ইসরায়েলের পক্ষে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সমর্থন যোগাড় করার চেষ্টা করছে।