কোন দিকে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ?

রবিবার (২ ডিসেম্বর) দুর্নীতির তৃতীয় অভিযোগেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে দেশটির পুলিশ। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনার জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের। তিনি চাইলে নেতানিয়াহুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হবে। এরকম পরিস্থিতিতে কোন দিকে যেত পারে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ? বার্তা সংস্থা রয়টার্স মনে করে, এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে তেমন কোনও বড় মাত্রার প্রতিবাদ দেখা না গেলেও, যতই পুলিশের ভাষ্য সামনে আসতে থাকবে ততই নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়তে থাকবে। প্রথমত তিনি পরবর্তী নির্বাচনে নাও জিততে পারেন। আর জিতলেও তিন তিনটি দুর্নীতির অভিযোগের বদনামের কারণে জোট গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শরিক পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে তার জন্য।2018-12-02T111218Z_1614420903_RC1A19681130_RTRMADP_3_ISRAEL-NETANYAHU-CORRUPTION

যেসব অভিযোগে নেতানিয়াহুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে পুলিশ, সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে হলিউডের এক প্রডিউসারের কাছ থেকে প্রায় তিন লাখ ডলার মূল্যের উপহার নেওয়ার, যার বদলে তিনি ওই ব্যবসায়ীকে অবৈধ সুযোগ পাইয়ে দিয়েছিলেন। এই অভিযোগের বিষয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি উপহার নিয়েছেন। কিন্তু তার বদলে সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি ফিল্ম প্রডিউসার ব্যবসায়ীকে কোনও অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেননি।

আরেকটি অভিযোগ হচ্ছে, ইসরায়েলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর একটি ইয়েদিওথ আহরোনোথকে সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রতিযোগী ইসরায়েল হেওমের সার্কুলেশন বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার। বদলে তিনি ইয়েদিওথ আহরোনোথে নিজের জন্য বেশি প্রচারণা দাবি করেছিলেন। ইয়েদিওথ আহরোনোথ চেয়েছিল, নেতানিয়াহু এমন আইন পাস করুক যাতে বিনামূল্যে বিতরণ করা ইসরায়েল হেওম পত্রিকাটি আর বিনামূল্যে বিতরণ করা না যায়।

তৃতীয় অভিযোগটি টেলিকম প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইসরায়েলের বাজেক টেলিকমকে সুবিধা পাইয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

ইসরায়েলের পুলিশ মনে করে তাদের হাতে এই তিন অভিযোগেই নেতানিয়াহুকে দোষী প্রমাণের মতো যথেষ্ঠ প্রমাণ রয়েছে। পুলিশের কাজ আপাতত এই পর্যন্তই। এখন ইসরায়েলের অ্যাটর্নি জেনারেল আভিচাই ম্যান্ডেলব্লিটের কাছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন নেতেনিয়াহুকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হবে কি না। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে মাসখানেক লেগে যেতে পারে।

আইনগতভাবে এ সময় প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে কোনও অসুবিধা নেই নেতানিয়াহুর। তিনি নিজেও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে পদে থাকারই ঘোষণা দিয়েছেন। আর এখন পর্যন্ত, জোটের শরিকদের পক্ষ থেকেও তার পদত্যাগের বিষয়ে তেমন কোনও জোরালো দাবি ওঠেনি। কিন্তু এখন যেহেতু পুলিশ তিন তিনটি অভিযোগের বিষয়েই শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে রয়টার্স মনে করে, পদত্যাগের বিষয়ে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়বে।

সেক্ষেত্রে কি হতে পারে নেতানিয়াহুর রাজনীতি ভবিষ্যৎ? বিশ্লেষকরা বলছেন, তার বিরুদ্ধে কোনও রকম তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলে তা প্রভাবিত করতে পিছপা হবেন না নেতানিয়াহু। সত্যি যদি চাপ বাড়ে তাহলে তিনি আগাম নির্বাচন দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করবেন। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত হয়ে থাকলেও এখন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছে। আগাম নির্বাচন দিলে তার দলই আবার ক্ষমতায় আসবে বলে মনে করে নির্বাচনি জরিপগুলো। নেতানিয়াহু যদি আগাম নির্বাচন দিয়ে জিতে যান তাহলে সেই জয়কে তিনি বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার কাজে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

জরিপে লিকুদ পার্টির এগিয়ে থাকার বিষয়টি ছাড়াও বর্তমান সরকারের আগাম নির্বাচন দেওয়ার অন্য কারণ রয়েছে। নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগডর লিবারম্যান পদত্যাগ করার পর নেতানিয়াহুর সরকারের এখন মাত্র এক সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। নেতানিয়াহুর সহযোগী রাজনীতিবিদরা মনে করেন, কোনও আগাম নির্বাচন হলে তা ২০১৯ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

কিন্তু নেতানিয়াহু যদি জিতেও যান, সেক্ষেত্রেও তিনটি অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করার মতো প্রমাণ আছে বলে পুলিশ যে দাবি করেছে তাতে রাজনৈতিক সমীকরণ প্রভাবিত হবে। তিনি যদি জিতেও যান তাহলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে শরিক নাও পেতে পারেন বলে মনে করে রয়টার্স।

নেতানিয়াহু না থাকলে নেতা হতে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিলাদ এরদান, গোয়েন্দামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী গিডিওন সার। তবে এখন পর্যন্ত তারা কেউই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কোনও ইঙ্গিত দেননি। তারা বরং আশায় আছেন, নেতানিয়াহু সরে দাঁড়ালে তারা তার স্থলাভিষিক্ত হবেন।

জনমত জরিপে লিকুদ পার্টির পরের অবস্থানে রয়েছেন মধ্যপন্থী ইয়েস। এর প্রধান ইয়েইর লাপিদ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী। ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজকে মধ্য বামপন্থী ডোভিশদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখেন বিশ্লেষকরা। তিনি যদি শেষ পর্যন্ত তাদের প্রার্থী হতে রাজি হন তাহলে ফলাফল নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলেও যেতে পারে।

এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বরাক সম্প্রতি ব্যাপকভাবে নেতানিয়াহুর সমালোচনা শুরু করেছেন। তিনিও একজন আলোচিত প্রার্থী। অন্যদিকে ডানপন্থীদের মধ্যে থাকা নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে নাম আসে পদত্যাগ করা সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিবারম্যানের। জিউইস হোম পার্টির নাফতালি বেনেটেকেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। লিকুদ পার্টির ফলাফল খারাপ হওয়ার পরেও যদি ডানপন্থীরা সরকার গঠনের মতো অবস্থায় থাকে তাহলে তিনি হতে পারেন তাদের নেতা।