নিজে না গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে কেন জিসিসিতে পাঠালেন কাতারের আমির?

সৌদি আরবের রিয়াদে শুরু হওয়া ‘গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের’ (জিসিসি) সম্মেলনে নিজে যাননি কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি। কিন্তু পাঠিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুলতান বিন সাদ আল মুরাইখিকে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিসিসি নিছক সৌদি নেতৃত্বক্ব বৈধতা দেওয়ার একটি প্লাটফরম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংগঠনটি অপরাপর উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কাতারের দ্বন্দ্ব নিরসনে কার্যকর কোনও ভূমিকা রাখতে পারবে না। সেখানে যাওয়া মানে শুধু সেই সৌদি আরবের নেতৃত্বকেই স্বীকৃতি দেওয়া যে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু কাতারকে মাথায় রাখতে হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণও। যুক্তরাষ্ট্রে যেহেতু মনে করে ইরানের প্রভাব ঠেকানোর জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা উচিত সেহেতু কাতার তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিসিসিতে পাঠিয়েছে। অন্য কোনও দেশ কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সুযোগ পাবে না, কাতার আলোচনার টেবিলে বসতে অনিচ্ছুক বা কাতার জিসিসিকে কার্যকর হতে দিতে চায় না।2018-12-09T145148Z_438701183_RC1CCC15F950_RTRMADP_3_GULF-QATAR
গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। আরব অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নতি, নিরাপত্তা বিধান ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এর সদস্য বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৮ সালে ০৯ ডিসেম্বর থেকে রিয়াদে শুরু হয়েছে সংগঠনটির ৩৯তম সম্মেলন।
মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সৌদি আরব অভিযোগ করে, কাতার ইরানকে সহযোগিতা করছে। কাতার সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার বা ইরানের ক্রীড়ানক হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু কাতারকে ২০১৭ সালের জুন থেকে অবরোধের মধ্যে রাখা হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে বাহরাইন, আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার দেশ মিসর।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গালফ স্টাডি সেন্টারের’ গবেষক মাহজুব জুয়েরি মনে করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের এই যে একসঙ্গে বসা, এই রীতিটাকে ব্যবহার করে সৌদি আরব নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তার ভাষ্য, ‘কাউন্সিল না থাকলে সৌদি আরবের এই অঞ্চলে কোনও ক্ষমতাই থাকবে না। কাউন্সিল আছে বলেই সৌদি আরব অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্বে আছে। এটাই তাদের জিসিসির ওপর এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ।’
তামিমকিন্তু আর যা-ই হোক, অন্তত উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কাতারের অস্থিতিশীলতার সমাধান জিসিসির আলোচ্যসূচির প্রথমদিকে থাকা বিষয় নয়। কুয়েতে অনুষ্ঠিত গতবারের সম্মেলনের সময়ই সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছিল, তারা সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও সামরিক সমঝোতা করছে। কুয়েত এবং ওমান সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের আগ্রাসী আচরণের কারণে কাতারের বিষয়ে নীরব। তারা জানে, আজ যা কাতারের সঙ্গে হচ্ছে কাল তা তাদের সঙ্গেও হতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সৌদি আরবের বাদশাহ কাতারের আমির তামিমকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন। তাদের দিক থেকে তার কাজ শেষ বলে ধরে নেবে। এই আনুষ্ঠানিকতার পর সৌদি আরব বলতে পারবে, এখন কাতারের পালা। আমরা তো একপা এগিয়েছি। মাহজুব জুয়েরি মন্তব্য করেছেন, এই কারণেই কাতারের আমির সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক গবেষক লুসিয়ানো জাকারার ভাষ্য থেকে স্পষ্ট হয় কেন তিনি নিজে না গেলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন। জাকারা মন্তব্য করেছেন, সৌদি আরবের নিমন্ত্রণ যদি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দেওয়া হতো তাহলে সদস্য দেশগুলো অভিযোগের সুযোগ পেত, কাতার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে ইচ্ছুক নয়। কাতার এমন কথা বলার পথ বন্ধ করে দিলো পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠিয়ে। তাছাড়া, ‘নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব কাতারের’ সহকারী অধ্যাপক জোসেলিন সেজ মিচেল বলেছেন, জিসিসির সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানোর মধ্য দিয়ে কাতার প্রতিবেশীদের সঙ্গে যথেষ্ট সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রাখে না এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থান গ্রহণ করল দেশটি।