সোলাইমানিকে হত্যা ভারতের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?

ইরানের প্রভাবশালী ও শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে করে উভয়পক্ষের মধ্যে নতুন সংঘাত শুরু হতে পারে।

download

 

২০০২ সালে কুদস ফোর্সের প্রধান হওয়ার আগ পর্যন্ত ধীরে ধীরে ইরানের সেনাবাহিনীতে মেধার প্রতিভা দিয়ে গেছেন সোলাইমানি। কুদস ফোর্স ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডস ফোর্সের (আইজিআরসি) অভিজাত শাখা। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা খামেনির খুব ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত তিনি। তার নেতৃত্বে সিরিয়া, লেবানন থেকে জার্মানি, এমনকি ভারতেও হত্যাকাণ্ড ও গুপ্তহত্যার অভিযান চালানো হয়েছে।

২০১২ সালে ভারতের রাজধানীতে ইসরায়েলি কূটনীতিকের গাড়িতে বোমা হামলার পর দিল্লি পুলিশ উপসংহারে পৌঁছায় যে, সন্দেহভাজন হামলাকারী আইআরজিসির সদস্য। ওই সময় থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও জর্জিয়ার তিবলিসে চালানো আইআরজিসি’র হামলার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার পর থেকেই উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। এতে ভারত, চীন ও জাপানের মতো বৃহত্তম আমদানিকারকদের তেল ক্রয় শূন্যতে নেমে আসে। এছাড়া গত বছর পারস্য উপসাগরে কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলায় উত্তেজনা আরও বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে।

আল-কুদস ফোর্স ও বাহিনীটির সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার মতো দেশে অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রভাব বিস্তৃত করার কাজে নিয়োজিত।

সাবেক সিআইএ প্রধান ডেভিড পেট্রিয়াস এক আলোচনায় সোলেইমানির প্রভাবের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ২০০৮ সালে ইরাকে মার্কিন অভিযানের সময় এক সিনিয়র ইরাকির নেতার মাধ্যমে সোলাইমানির একটি বার্তা পান। ওই বার্তায় বলা হয়েছে, জেনারেল পেট্রিয়াস, আপনার জানা উচিত যে আমি কাসেম সোলাইমানি। আমিই ইরাক, লেবানন, গাজা ও আফগানিস্তান বিষয়ক ইরানের নীতি নিয়ন্ত্রণ করি। আর অবশ্যই বাগদাদে ইরানি রাষ্ট্রদূত কুদস বাহিনীর একজন সদস্য। তার পরিবর্তে যিনিই আসবেন তিনিও হবেন কুদস বাহিনীর সদস্য।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার খুব ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে সোলাইমানির মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। আইআরজিসি ও কুদস বাহিনী সরাসরি খামেনির নির্দেশে চলে। এছাড়া অনেকেই মনে করেন, ইরানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী ছিলেন সোলাইমানি।

ইরানের গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা সাংবাদিক ইয়াশার আলি এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলার নির্দেশ যদি দেন সর্বোচ্চ নেতা, আমরা অবাক হবো না। যুক্তরাষ্ট্রেও গুপ্তহত্যা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। আমরা হয়তো সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ও কঠোর পাল্টা হামলা দেখবো।

অপর এক টুইটে তিনি লিখেছেন, কিন্তু সোলাইমানিকে হত্যা যেকোনও সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান নিহতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে না। তাকে হত্যা হলো একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান ও রাষ্ট্রের প্রধানকে হত্যার শামিল। বিষয়টিকে এভাবেই দেখতে হবে। গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এমন পর্যায়ের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় দেশের সঙ্গেই ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সম্প্রতি ইরান সফর করেছেন। সফরে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পশ্চিম এশিয়ায় প্রায় ৮০ লাখ ভারতীয় প্রবাসী বসবাস করছেন। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনও ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা দিল্লির চিন্তার কারণ হয়। প্রভাব পড়ে ভারতীয় অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে, বিশেষ করে অপরিশোধিত তেলের বাজারে।
উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতি বছর ৪০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায় ভারতীয় প্রবাসীরা। মধ্যপ্রাচ্যে কোনও সংঘাত শুরু হলে প্রবাসীরা দলে দলে দেশে ফিরতে শুরু করলে এই রেমিট্যান্সে ধস নামবে। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস