পঞ্চাশ বছর আগে এই সপ্তাহে ইসরায়েলে মিসর ও সিরিয়ার আকস্মিক হামলায় শুরু হয়েছিল ইয়ম কিপ্পুর যুদ্ধ। শনিবার ভোরে ইহুদিদের ছুটির শেষ দিনে আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। রকেট হামলা ও বিমান হামলার সতর্ক সংকেতে ঘুম ভাঙে ইসরায়েলিদের। ওই দিন ভোরে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। যা ১৯৭৩ সালের পর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার ৭৫ বছর পর এই প্রথম ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা গ্রিন লাইনের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। গ্রিন লাইনের অপর পাশ হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা। রবিবার বিকাল পর্যন্ত ৪ শতাধিক ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৩ শতাধিক। ধারণা করা হচ্ছে, হামাস যোদ্ধারা বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা ও বেসামরিক ব্যক্তিকে জিম্মি করে গাজা উপত্যকায় নিয়ে গেছে।
২০১৪ সালে পশ্চিম তীরে তিন ইসরায়েলি সেনা হত্যার ঘটনায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। কিন্তু শনিবার যা ঘটেছে তা আরব-ইসরায়েল সংঘাতে কখনও ঘটেনি। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ছিল সেনাবাহিনীর মধ্যে, কিন্তু এবার উভয় পক্ষের সাধারণ জনগণের ওপর সংঘাতের পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
২০০৭ সাল থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হামাসের কর্মকর্তারা প্রায় সময় বলে আসছিলেন, নিজেদের পছন্দ মতো সময় ও স্থানে ইসরায়েলি হামলার জবাব দেওয়া হবে। কিন্তু শনিবারের হামলায় ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা—সাগর, স্থল ও বিমান হামলায় ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা অবাক হয়েছেন।
জেরুজালেমে ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল আকসায় ইহুদিদের প্রবেশের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হামাস এই হামলা চালিয়েছে। যদিও অতীতে জেরুজালেমে আরও বড় ঘটনায় কম গুরুতর হামলা চালিয়েছে তারা।
হামাস এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘আল-আকসা প্লাবন’। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই সংঘাতে জেরুজালেম ও পশ্চিম তীর বা লেবাননের হেজবুল্লাহ জড়িয়ে পড়তে পারে। ২০২১ সালে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানের সময় সড়কগুলোতে আন্তসম্প্রদায়ের সহিংসতার ঘটনা এখনও অনেকের স্মৃতিতে তাজা।
হামাসের এই হামলাকে অনেকে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছেন। ইসরায়েল নিশ্চিত ছিল হামাস সর্বাত্মক যুদ্ধ চাইছে না। দুই পক্ষ সম্প্রতি কাতার, মিসর ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছে। টানা তিন সপ্তাহের সহিংসতা ও বিক্ষোভের পর তাদের মধ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ইসরায়েল মনে করেছিল, গত দুই বছর ধরে গাজার অর্থনীতির চালিকাশক্তি ১৮ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনির ওয়ার্ক পারমিটকে জটিলতায় ফেলতে চাইবে না হামাস। এর মাধ্যমে গাজার পুরুষরা ইসরায়েলের নির্মাণ ও কৃষি খাতে কাজের অনুমতি পেতেন।
২০২১ সালের মে মাসের সংঘাতের পর এই কৌশল প্রণয়ন করা হয়। অবরুদ্ধ গাজা থেকে গত ১৪ বছরে যত মানুষ ইসরায়েলে প্রবেশ করেছেন, গত ৩০ মাসে প্রায় সমান সংখ্যক যাতায়াত করেছেন। প্রতিদিন তারা ২০ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড আয় করে গাজায় নিয়ে এসেছেন। গাজার প্রায় ২৩ লাখ মানুষের মধ্যে অর্ধেকের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন।
হামাসের সামরিক শাখা কাসেম ব্রিগেড ও ইসলামিক জিহাদের ছিল অন্য পরিকল্পনা। ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল পশ্চিম তীর। এতে উসকানি ছিল হামাসের। যারা আরেকটি ফিলিস্তিনি গণজাগরণ বা তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরু করতে চাইছিল।
পরিস্থিতি অনুসারে মনে হচ্ছে, হামাস নেতারা নিজেদের পছন্দ মতো হামলা চালাতে চেয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা পশ্চিম তীরে দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্বল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের চেয়ে নিজেদের ভালো অবস্থানে দেখাতে চেয়েছে। ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
এই অবাক করা হামলা নিশ্চিতভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে উদ্যোগ চলমান তা ভেস্তে যাবে। মুসলিমদের দুটি পবিত্র স্থান থাকা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। ১৯৯০ দশকে ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের শাসক দল ফাতাহের মধ্যে ওসলো শান্তিচুক্তির বিরোধিতায় সহিংসতার পথ নিয়েছিল হামাস।
দীর্ঘমেয়াদে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীটি কী অর্জন করতে চাইছে তা অস্পষ্ট। এছাড়া এমন বড় আকারের সুসংগঠিত হামলায় হেজবুল্লাহ বা ইরানের কাছ থেকে তারা কেমন সহযোগিতা পেয়েছে তাও স্পষ্ট নয়। তবে এটি একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ১৬ বছর ধরে গাজায় ইসরায়েল যে অবরোধ জারি করে রেখেছে তা আর টিকবে না।
এই হামলার ফলে ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি সরকারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এমনিতেই বিচার ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ডিসেম্বরে নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার উগ্রপন্থিরা এই হামলাকে অঞ্চলটিতে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে তুলে ধরতে চাইবে।
২০১৪ সালের পর গাজায় প্রথমবার স্থল অভিযান শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এখন পর্যন্ত একটি বিষয় সবচেয়ে স্পষ্ট। আর তা হলো ১৬ বছরের ইসরায়েলি অবরোধে বিপর্যস্ত গাজাবাসীকে আবারও সবচেয়ে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান