এমন হামলা কখনও দেখেনি গাজাবাসী

ফিলিস্তিনের রেড ক্রিসেটের মুখপাত্র নেবাল ফারশাখ বলেছেন, অতীতের লড়াইয়ে সর্বদা বিমান হামলায় কিছু সময় বিরতি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন, একটি মিনিটও পাওয়া যাচ্ছে না। তাই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই।

গাজা শহরের শিফা হাসপাতালে মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির প্রতিনিধি দেখেছেন, কীভাবে বিছানার চাদরে ঢাকা একের পর এক মরদেহ স্রোতের মতো আসছে। হাসপাতালের কর্মীরা যখন মেঝেতে রক্তের দাগ মুছছেন তখন বোমার শ্র্যাপনেলের আঘাতে আহত শিশুদের নিয়ে আসছেন আত্মীয়রা। হাসপাতালের আশেপাশে তখনও একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটছে।

বৃহস্পতিবার ৬ষ্ঠ দিনেও গাজায় তীব্র বোমা বর্ষণ অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। গাজার অধিবাসীরা যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকলেও অতীতে তারা এমন কিছু দেখেননি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, শনিবার থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের মধ্যে কতজন বেসামরিক রয়েছেন তা জানাননি কর্মকর্তারা। তবে ত্রাণ কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, ২৩ লাখ অধিবাসীর গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সর্বাত্মক অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তের ফলে একটি মানবিক বিপর্যয় এগিয়ে আসছে। যা ঘনবসতিপূর্ণ ছিটমহলের সবাইকে আক্রান্ত করবে।

উপত্যকাজুড়ে বিশুদ্ধ পানি নেই। অঞ্চলটির একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে বুধবার বন্ধ হয়ে গেছে। রাতের বেলা অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকছে পুরো ছিটমহল।

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা। ছবি:এপি

ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী গিশা-এর মুখপাত্র মিরিয়াম মারমুর বলেন, এটি নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করার ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের ফলে ফিলিস্তিনিদের ঝুঁকি বাড়ছে এবং মৃত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার হুমকিও রয়েছে।

শনিবার হামাস যোদ্ধাদের হামলার জবাবে এই বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে ইসরায়েল। হামাসের হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। শতাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক ইমার্জেন্সি প্রধান রিচার্ড ব্রেনান বলেছেন, এমনকি সাধারণ সময়েও গাজার হাসপাতালে সরবরাহ খুব কম। এখন ব্যান্ডেজ থেকে স্যালাইন, বিছানা থেকে অত্যাবশ্যক ওষুধ সবকিছুর ঘাটতি রয়েছে।

ব্রেনান আরও বলেছেন, পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ হতে পারে না। শুধু ক্ষয়ক্ষতি নয়, ধ্বংসযজ্ঞ। মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ...সহকর্মীদের হারানোর মানসিক চাপ।

শিফা হাসপাতালে মুহাম্মদ আল-ঘারাবি এপিকে বলেছেন, সোমবার সমুদ্রের তীরবর্তী শাতি শরণার্থী শিবিরের মসজিদে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। তার দুই বছরের ছেলে মোহাম্মদ ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলে লতফি পায়ে বোমার শ্র্যাপনেলের আঘাতে আহত।

আল-ঘারাবি বলেছেন, হুঁশ আসার পর দেখেছেন আশেপাশের বাড়িতে কয়েক ডজন মরদেহ পড়ে আছে।

ইসরায়েল দাবি করে আসছে, তারা শুধু হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বেসামরিক হতাহত এড়ানোর জন্য। কিন্তু অনেক ফিলিস্তিনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তত আট সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ছয় চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, তাদের ১১ কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন।

চার সন্তানের বাবা ৩৫ বছর বয়সী ইয়ামেন হামাদ বাস করতেন গাজার উত্তরাঞ্চলীয় বেইত হানুন শহরে। ইসরায়েলি হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। রয়টার্সকে  তিনি বলেছেন, অতীতের সব যুদ্ধ ও হামলা দেখেছি আমি। কিন্তু এই যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ কিছু কখনও দেখিনি।

এই গ্রামটি ইসরায়েলের কাছাকাছি। পাল্টা হামলার শুরুতে যেসব স্থানে আক্রমণ হয় এটি ছিল সেগুলোর একটি। হামাস ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এখানকার অনেক সড়ক ও ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।

ইসরায়েলি সেনাদের কামানের গোলাবর্ষণ। ছবি: এপি

আল আল-কাফারনেহ নামের আরেক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেছেন, শনিবার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, বাবা, ভাইসহ কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। তারা গাড়ি নিয়ে উপকূলীয় শরণার্থী শিবিরে পৌঁছান। তারা আশা করেছিলেন, সেখানে নিরাপদ থাকবেন। কিন্তু এখানেও বিমান হামলা শুরু হয়। ফলে তারা সুদূর পূর্বে শেখ রেদওয়ানের দিকে যাত্রা শুরু করেন।

শিফা হাসপাতালে বাইরে থাকা অবস্থায় কাফারনেহ জানান, মঙ্গলবার রাতে তারা যে ভবনে ছিলেন সেটিতে বোমা আঘাত হানে। তিনি ছাড়া পরিবারের সবাই মারা গেছেন। তার কথায়, ‘আমরা বিপদ থেকে পালিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছি।’

হাসপাতালের বাইরে যেখানে দাঁড়িয়ে কাফারনেহ কথা বলছিলেন সেখানে কয়েক শ’ মানুষ জড়ো হয়েছেন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, হাসপাতাল হয়ত তাদেরকে বোমাবর্ষণের হাত থেকে রক্ষা করবে।

কেউ কেউ কম্বল ও কার্ডবোর্ড নিয়ে এসেছেন ঘুমানোর জন্য। অন্যরা একেবারে মাটিতে শুয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের ভেতরে থাকা টয়লেট ব্যবহারের জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন রয়েছে।

এদের একজন ইউসেফ দায়ের রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি এখন গৃহহীন। তার আশা, হয়ত এই স্থান নিরাপদ। হয়ত। এটি শান্তিপূর্ণ বেসামরিক স্থান, টিক তো? নাও হতে পারে। কোনও জায়গাকে এখন আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।

সূত্র:  দ্য গার্ডিয়ান