বোমা বর্ষণ ও অবরোধে হামাসকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে: ইসরায়েল

ইসরায়েল বলেছে, অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সোমবার দিবাগত রাতে বেশ কয়েকজন হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। এই যুদ্ধ হামাসকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য। যুদ্ধের অংশ হলো বোমাবর্ষণ ও ফিলিস্তিনি ছিটমহলে অবরোধ জারি রাখা। হামাসকে নিশ্চিহ্ন করতে সময় লাগবে। মঙ্গলবার ইসরায়েলি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এসব কথা বলেছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

গাজায় আরও ত্রাণ সরবরাহে অনুমতি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। দুই সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকায় মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। ২৩ লাখ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, এখন পর্যন্ত যে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে তা একেবারে অপ্রতুল। এখনও জরুরি জ্বালানি প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পূর্ব ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের জরুরি সহযোগিতা বিষয়ক পরিচালক ডা. রিক ব্রেনান বলেছেন, টেকসই, বিস্তৃত ও সুরক্ষিত মানবিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা একেবারে নাজুক অবস্থায় রয়েছি।

কয়েক দশকের মধ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়ে খুব শিগগিরই কোনও যুদ্ধবিরতির আশা এখনও তৈরি হয়নি। গাজার চিকিৎসা কর্মকর্তারা বলেছেন, সোমবার দিবাগত রাতের হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক ফিলিস্তিনি আহত বা নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, দুই সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার জবাবে এই বোমাবর্ষণ করে যাচ্ছে দেশটি। হামাসের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

সোমবার দুই ইসরায়েলি নারীকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। হামলার দিন হামাস কর্তৃক অপহৃত দুই শতাধিক জিম্মির মধ্যে এই দুই নারী ছিলেন। এর আগে আরও দুই জিম্মি মুক্তি পেয়েছেন।

ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনা গাজা সীমান্তে মোতায়েন করা হয়েছে। সম্ভাব্য স্থল অভিযান পরিচালনার জন্য তারা নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, স্থল অভিযান পরিচালনা করলে গাজায় থাকা জিম্মিদের মুক্ত করা জটিলতায় পড়তে পারে।

মঙ্গলবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সোমবার দিবাগত রাতে গাজায় ৪০০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে এবং কয়েক ডজন হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন ডেপুটি কমান্ডার রয়েছেন।

তারা আরও জানিয়েছে, আঘাত হানা লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে একটি সুড়ঙ্গ ও একটি মসজিদ। রয়টার্সের পক্ষ থেকে তাদের দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গাজার বিশাল অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে দশ লাখের বেশি বাসিন্দা বাধ্য হয়েছেন অন্যত্র আশ্রয় নিতে। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জ্বালানি ফুরিয়ে যাচ্ছে।

এর আগে ইসরায়েলি চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল হারজি হালেভি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হামলার তীব্রতা কমানোর কোনও ইচ্ছা নেই ইসরায়েলের। তিনি বলেন, আমরা হামাসকে একেবারে গুঁড়িয়ে দিতে চাই। গাজার দক্ষিণে স্থল অভিযান পরিচালনায় আমরা প্রস্তুত।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হাগারি বলেছেন, যুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা রাজনৈতিক নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।

তবে কত দ্রুত সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তা স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীকে প্রায় ৩০ হাজার হামাস যোদ্ধাদের মোকাবিলা করতে হবে। ইরানের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীটি নিজেদের অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছে। ইসরায়েলি সেনাদের লড়াই করতে হবে শহুরে অঞ্চলে। যেখানে হামাস যোদ্ধারা গাজাজুড়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ গড়ে তুলেছে।

গাজার চিকিৎসাকর্মীরা বলছেন, সোমবার দিবাগত রাতের হামলায় কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। বেশিরভাগ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণ গাজায়। অন্তত ১৫টি বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন, খান ইউনিসে একটি পেট্রোল স্টেশনে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এখানে কর্মী, বিভিন্ন পরিবারের সদস্য ও শহরের পূর্বাঞ্চল থেকে স্থানান্তরিত অনেকে জড়ো হয়েছিলেন। বেশ কয়েকজন আহত ও নিহত হয়েছেন।

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কিদরা বলেছেন, ৪০টির বেশির চিকিৎসাকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে সেবাদান বন্ধ করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বোমাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিদেশি রাষ্ট্রনেতারা আশঙ্কা করছেন, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে পশ্চিম তীর ও লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।

হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করা কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি এক ভাষণে বলেছেন, আমরা বলছি যথেষ্ট হয়েছে। ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ও শর্তহীনভাবে হত্যার অনুমতি দেওয়া যায় না।

ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন প্রকাশে মঙ্গলবার তেল আবিব পৌঁছেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। জেরুজালেমে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন।  

ম্যাক্রোঁ বলেছেন, হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসরায়েলকে ছেড়ে যাবে না ফ্রান্স। কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন তিনি।

তার পাশে দাঁড়িয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন, এই সংঘাতের পর কেউ হামাসের অধীনে বসবাস করবে না। কিন্তু এই যুদ্ধে সময় লাগতে পারে।