ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ট্যাংক ও পদাতিক সেনা নিয়ে অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। রবিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তাদের অভিযানে অগ্রগতি হচ্ছে। ‘সন্ত্রাসীদের’ বেশ কয়েকটি সেল গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং হামাসের একাধিক কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে। হামাস দাবি করেছে, ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনারা গাজা শহরের উপকণ্ঠ থেকে ফিরে গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইসরায়েলি ট্যাংক গাজা শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছেছে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে। জায়তুন জেলায় ইসরায়েলি ট্যাংক দেখা গেছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, তারা সালাহ আল দিন সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে এবং সড়ক দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টাকারী যানবাহনে গুলি করছে ইসরায়েলি সেনারা।
অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান গাজার পূর্ব দিক থেকে অগ্রসর হয়ে গাজা শহরের সালাহ আল দিন সড়কে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, গাজায় তারা ধীরগতিতে অগ্রগতি অর্জন করছেন এবং যুদ্ধের পর্যায় ও লক্ষ্য অনুসারে আক্রমণ জোরদার করা হবে।
ইসরায়েলের এই দাবির পর এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, সালাহ আল দিন সড়ক থেকে ইসরায়েলি ট্যাংক ফিরে গেছে।
গাজায় হামাস সরকারের প্রধান সালমা মারুফ বলেছেন, গাজা উপত্যকার আবাসিক এলাকায় অগ্রসর হওয়ার কোনও সুযোগ নেই। সালাহ আল দিন সড়কে যা ঘটেছে তা হলো দখলদার সেনাবাহিনীর কয়েকটি ট্যাংক ও বুলডোজার প্রবেশ করেছিল। এই সামরিক যানগুলো দুটি বেসামরিক গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেছে চলে যাওয়ার আগে। এখন সেখানে কোনও দখলদার সেনার উপস্থিতি নেই। সড়কটিতে মানুষের যাতায়াত স্বাভাবিক হয়েছে।
৭ অক্টোবর গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সম্প্রতি উপত্যকায় স্থল অভিযান শুরু করেছে তারা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩০৬ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৯৫০ জন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বলছে, হামাসের হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৩৮ জনে।
পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় জার্মানির আহ্বান
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই দখলকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি সেটেলারদের হামলায় প্রাণহানির পর এই আহ্বান জানানো হলো।
মুখপাত্র বলেছেন, দশক ধরে যে স্থানে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো বসবাস করে আসছে সেখান থেকে তাদের যেন উচ্ছেদ করা না হয় তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
যুদ্ধ বন্ধ করুন: ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী
গাজায় খাদ্য, ওষুধ, পানি ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য নিরাপদ মানবিক করিডোর চালু করার দাবি করেছেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাত্তাইয়া।
তিনি বলেছেন, আমরা জোরালো কণ্ঠে বলছি, আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করুন।
শাত্তাইয়া উল্লেখ করেছেন, গাজার মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিন ২০ ট্রাক ত্রাণ পর্যাপ্ত নয়।
তেহরানকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকুন: যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার জন্য তেহরানকে দায়ী করা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরত থাকা উচিত।
গাজার পরিস্থিতির জন্য ইরানকে দায়ী করার বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মুখপাত্র নাসের কানানি বলেছেন, বন্ধ করুন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যা অব্যাহত রাখলে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট খোলা হবে। মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেছেন।
তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থন ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার রসদ জুগিয়েছে। ইসরায়েলের আগ্রাসনে বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি নারী ও শিশু নিহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল যদি যুদ্ধ বন্ধ না করে এবং অপরাধযজ্ঞ অব্যাহত রাখে তাহলে যুদ্ধের নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট খুলবে এবং তা কোনোমতেই ঠেকানো যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা উল্লেখ করে আমির আব্দুল্লাহিয়ান বলেছেন, একদিকে মার্কিন সরকার এই যুদ্ধ থেকে অন্য দেশগুলোকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে, অন্যদিকে তারা সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করছে।
গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বাধা একটি অপরাধ হতে পারে: আইসিসি প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় মানবিক ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়া একটি অপরাধ হতে পারে।
কায়রোতে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, জেনেভা কনভেনশন দ্বারা প্রদত্ত ত্রাণ সরবরাহে বাধা দেওয়া আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে একটি অপরাধ হতে পারে।
গাজায় প্রবেশের একমাত্র পথ রাফাহ ক্রসিং পরিদর্শনের পর তিনি কায়রোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, গাজায় প্রবেশ করতে না পেরে অসংখ্য ত্রাণবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে।
করিম খান বলেন, পণ্যভর্তি, মানবিক সহযোগিতা বোঝাই ট্রাকগুলোকে এমন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, যেখানে এগুলো কারও প্রয়োজন নেই। কোনও বিলম্ব ছাড়াই এগুলো গাজার বেসামরিকদের কাছে পৌঁছা উচিত।
সূত্র: আল জাজিরা, টিআরটি ওয়ার্ল্ড