হামাস কমান্ডার দেইফকে হত্যায় অষ্টম চেষ্টাতেও কি ব্যর্থ ইসরায়েল?

ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফকে হত্যার জন্য গাজার খান ইউনিসে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। শনিবার ভোরে দক্ষিণ গাজায় পরিচালিত তাদের অভিযানে অন্তত ৯০ জন নিহত হয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েল নিশ্চিত হতে পারেনি দেইফ নিহত হয়েছেন কিনা।

তিন দশক ধরে ইসরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে মোহাম্মদ দেইফের নাম। এর আগে তাকে হত্যার জন্য ইসরায়েল সাতবার চেষ্টা করেছে। শনিবারের অভিযান ছিল তাকে হত্যার জন্য ইসরায়েলের অষ্টম চেষ্টা। এর পূর্বে সর্বশেষ ২০২১ সালে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার একজন মাস্টারমাইন্ড হিসেবে তাকে মনে করা হয়। তার বিরুদ্ধে আত্মঘাতী বোমা হামলায় কয়েক ডজন ইসরায়েলিকে হত্যার অভিযোগ এনেছে।

অভিযানের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, দেইফ নিহত হয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। তিনি বলেছেন, অপর এক হামাস কমান্ডার নিহত হয়েছেন। হামাস নেতৃত্বকে নির্মূলের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। তার দাবি, সামরিক চাপ আলোচনার টেবিলে জিম্মি মুক্তির সমঝোতার সুযোগ বাড়াবে।

হামাস নেতারা দাবি করেছেন, দেইফ নিহত হননি। আল জাজিরাকে তারা বলেছেন, নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের অভিযান পরিচালনার দাবি মিথ্যা। তারা বেসামরিকদের ওপর হামলাকে ন্যায্যতা দিতে এগুলো বলছে।

গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গাজায় এটিই ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিযান।

হামাসের উপপ্রধান খলিল আল-হায়া বলেছেন, যেকোনও ফিলিস্তিনি শিশুর চেয়ে মোহাম্মদ আল-দেইফ ও তার ভাইয়ের রক্ত বেশি মূল্যবান নয়। যাই হোক, নেতানিয়াহু, আপনি চরম ব্যর্থ হয়েছেন। কমান্ডার দেইফ আপনার কথা শুনছেন এবং মিথ্যাচার শুনে হাসছেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, ৭ অক্টোবরের হামলায় হামাসের গাজা প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সঙ্গে পরিকল্পনাকারী ছিলেন দেইফ। হামাসের সামরিক শাখারও প্রধান তিনি।

ইসরায়েলি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আল-মাওয়াসি এলাকায় হামাসের যে ঘাঁটিতে অভিযান চালানো হয়েছে সেখানে দেইফ উপস্থিত থাকলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কম। দেইফের সহকারী রাফা সালামেহও সেখানে থাকলে জীবিত থাকবেন না।

অজ্ঞাত তারিখের ছবিতে হামাস কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফ (ডানে)। ছবি: আইডিএফ/টাইমস অব ইসরায়েল

তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল বলে দাবি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর। টাইমস অব ইসরায়েল লিখেছে, মরদেহ পাওয়া যাক বা না-যাক, আজ নয়তো কাল গোয়েন্দা তথ্যে তার পরিণতি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

দেইফ নিহত হয়ে থাকলে তা হামাসের জন্য হবে একটি বিপর্যয়কর আঘাত। হামাস যোদ্ধা ও সমর্থকদের মধ্যে দেইফের প্রভাব অনেক। অনেকের কাছে তিনি কিংবদন্তি। তিনি গাজায় হামাসকে ইসরায়েলবিরোধী আদর্শে উজ্জীবিত করেছেন।

সিনওয়ার প্রকাশ্যে হাজির হতেন। কিন্তু দেইফ খুব কমই প্রকাশ্যে এসেছেন। এমনকি গত কয়েক বছরে প্রকাশ্যে তার কোনও ছবিও নেই। সর্বশেষ জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তার একটি ছবি প্রকাশ করেছে। যদিও তা কবে তোলা হয়েছিল তা জানা যায়নি। গাজায় অভিযানে ছবিটি পেয়েছে তারা।

৭ অক্টোবরের হামলার পরিকল্পনার পাশাপাশি সিনওয়ারের সঙ্গে মিলিতভাবে ৯ মাসের যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন দেইফ।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, অবশ্য দেইফ নিহত হলেও সিনওয়ার একা হয়ে পড়বেন না। ইতোমধ্যে হামাসের সামরিক শাখার উপপ্রধান মারওয়ান ইসা ও অভিযানিক প্রধান রাইদ সাদ নিহত হয়েছেন। তবে এখনও সিনওয়ারের ভাই মোহাম্মদ সিনওয়ার ও অপর কমান্ডাররা জীবিত রয়েছেন।

এই অভিযানে বেসামরিক প্রাণহানির ফলে কাতারে চলমান যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির সমঝোতার আলোচনা সাময়িক জটিলতায় পড়তে পারে। আর যদি দেইফ নিহত হয়ে থাকেন তাহলে তা হামাসের ওপর সামরিক চাপ বাড়াবে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ডেভিড হরোবিৎজ লিখেছেন, যদি দেইফের মৃত্যু হয় তাহলে তা হামাসের সামরিক ও বেসামরিক শাসনক্ষমতা ভেঙে দিতে ও জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে ইসরায়েলি যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে দিতে পারে। এটি হামাসের ভেঙে পড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নিয়ে আসতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স, টাইমস অব ইসরায়েল, আল জাজিরা