গুপ্তহত্যার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের ঝুঁকি কতটা?

ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর দুই শীর্ষ নেতার গুপ্তহত্যার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই দুটি গোষ্ঠী ইরানের কাছ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়ে আসছে। হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়েহকে হত্যা করা হয়েছে ইরানের রাজধানী তেহরানে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলে এ খবর জানিয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহ কমান্ডার ফুয়াদ শুকুরকে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ পাওয়া গেছে। গোলান মালভূমিতে রকেট হামলায় ১২ শিশুকে হত্যার জন্য শুকুরকে দায়ী করেছে ইসরায়েল।

বুধবার হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়েহ তেহরানে নিহত হয়েছেন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর একাধিকবার হানিয়েহকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিয়ে আসছিল ইসরায়েল। যদিও এই হামলার বিষয়ে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। কিন্তু ধারণা করা হচ্ছে, তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অতীতেও একাধিক হামাস নেতা ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন।

হামাসের সশস্ত্র শাখা ইতোমধ্যে একটি বিবৃতি জারি করেছে। তারা হানিয়েহ হত্যার প্রতিশোধ বড় আকারের হবে বলে অঙ্গীকার করেছে।

পরিণতি হবে ভয়াবহ

ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক কেলি পিটিলো বলেছেন, দুই গুপ্তহত্যার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে মধ্যপ্রাচ্যে। তার মতে, এর পরিণতিতে কী ঘটবে বলার সময় এখনও আসেনি। তবে তা খুব ভয়াবহ হবে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ডের ফলে হামাস ও হিজবুল্লাহর জনপ্রিয়তা বাড়বে। হানিয়েহকে হত্যার মাধ্যমে হামাসের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নির্মূল করেছে। তিনি ছিলেন গোষ্ঠীটির মধ্যে অনেকটাই মধ্যপন্থি। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনায় তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পিটিলো বলেন, এখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে হামাসের সামরিক শাখা আরও বেশি সমর্থন পাবে। তারা বলতে পারবে: দেখুন, হানিয়েহ কূটনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। এখন কী পরিণতি হয়েছে। এর ফলে হামাসের সামরিক শাখার কট্টরপন্থি নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসবে।

২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করা হামাস দুটি ভাগে বিভক্ত। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কাতারভিত্তিক এবং গাজায় তাদের সামরিক নেতৃত্ব। ২০১৭ সাল থেকে গাজা শাসন করে আসছেন সামরিক শাখার নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার।

ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর পুনর্মিলন ও যুদ্ধবিরতির জন্য ধাক্কা

হানিয়েহকে হত্যা চীনের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার পুনর্মিলনকে জটিলতায় ফেলতে পারে। সম্প্রতি ১৪টি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি হয়েছিল। যুদ্ধের পর গাজা শাসন নিয়ে তাদের এই ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এছাড়া, এই ঘটনা হামাসের হাতে থাকা ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনাকে জটিলতায় ফেলতে পারে।

জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক সাইমন ওলফগ্যাং ফিউকস বলেছেন, এই মুহূর্তে পুরো পরিণতি আন্দাজ করা মুশকিল। কিন্তু আশঙ্কা করা হচ্ছে, জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতির সমঝোতা এখন দূরবর্তী। হামাস স্বাভাবিক আলোচনায় ফিরতে পারবে না।

চাপে হিজবুল্লাহ ও ইরান

লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

পেটিলো বলেছেন, শীর্ষস্থানীয় নেতা ফুয়াদ শুকুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে বড় ধরনের চাপে রয়েছে গোষ্ঠীটি। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিই শুধু নয়, আশঙ্কার জায়গা হলো হামাসের সমর্থনে গোষ্ঠীটি আরও বেশি সক্রিয় হতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেছেন, এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহ খুব স্পষ্ট করেছে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে তারা ইসরায়েলে হামলা বন্ধ করবে। শুকুর হত্যাকাণ্ড হিজবুল্লাহকে দেশে ও সংগঠনের মধ্যে জটিলতায় ফেলে দিয়েছে এবং হানিয়েহ হত্যা ইরানকে চাপে ফেলেছে।

বছরের পর বছর হিজবুল্লাহ ও হামাসকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে ইরান। সাইমনের মতে, তেহরানে হানিয়েহকে হত্যা ইরানকে অপমান করার শামিল। সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে হাজির হতে গিয়েছিলেন হামাস নেতা। কথিত প্রতিরোধ অক্ষের অনেক নেতা হাজির হয়েছিলেন।

সাইমন বলেছেন, নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানের সময় হানিয়েহকে হত্যার ঘটনা প্রতীকী। ইসরায়েল দেখাতে চেয়েছে ইরান নিজেদের অতিথিদের সুরক্ষা দিতে পারে না।

পেটিলোও সম্মতি জানিয়ে বলেছেন, সবার নজর এখন তেহরানের দিকে। কারণ গুপ্তহত্যাটি ইরানের মাটিতে ঘটেছে। ইরান প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হবে।

ইরানি সরকার হানিয়েহ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে তিন দিনের সরকারি শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।