লেবাননের মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যার পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েলিদের মনোবলও উজ্জীবিত হয়েছে। অক্টোবরে হামাসের হামলা এবং এক বছরের যুদ্ধের ধাক্কা সামলানোর পর এটি ইসরায়েলের জনগণের জন্য স্বস্তি এনে দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অবস্থানকেও দৃঢ় করেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
শনিবার বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নাসরাল্লাহ নিহত হওয়ার পরে নেতানিয়াহু টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে এই ঘটনাকে ‘যুদ্ধের মোড় ঘোরানো’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এক বছরের মধ্যে একের পর এক আঘাতে তাদের আশা ভেঙে দিয়েছে। ইসরায়েলের গতি আছে, আমরা জয়ী হচ্ছি।’
অক্টোবরের হামাসের আক্রমণে নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করা হলেও, নাসরাল্লাহর মৃত্যুর পর তার জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে। এর আগে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহর হত্যার মধ্যেও নেতানিয়াহু তার অবস্থান মজবুত করেছিলেন। সাবেক মিত্র গিডিয়ন সা’আরকে আবারও সরকারে যুক্ত করে, নেতানিয়াহু তার জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ১২০ আসনের কনেসেটে ৬৮-এ নিয়ে এসেছেন।
রবিবার প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জনপ্রিয়তায় ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করছে, যদিও নির্বাচনে পরাজয়ের সম্ভাবনা এখনও আছে। তবে যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর পারফরম্যান্স সম্পর্কে ৪৩ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন, যা আগের ৩৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অক্টোবরের ৭ তারিখের হামলা ইসরায়েলিদের মনোবল ভেঙে দিয়েছিল, যেখানে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫০ জনের বেশি লোককে জিম্মি করা হয়েছিল। এটিকে ইয়োম কিপুর যুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উত্তর ইসরায়েলে হাজার হাজার মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায় যখন হিজবুল্লাহ হামাসের সমর্থনে রকেট নিক্ষেপ শুরু করে।
যদিও ইসরায়েল এখনও গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং হামাসকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করতে পারেনি। তবে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান আলাদা। নাসরাল্লাহর নেতৃত্বে হিজবুল্লাহ একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং ইসরায়েল এটিকে হামাসের চেয়ে অনেক বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল।
এখন হিজবুল্লাহর অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হয়েছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। এই ঘটনাগুলো ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করেছে।
ইসরায়েলের কর্মকর্তারা মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ড গাজা যুদ্ধে সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সমস্যাগুলোর মতো কোনও সংকট তৈরি করবে না। ইসরায়েল এখন জাতিসংঘের প্রস্তাব ১৭০১ কে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। ওই প্রস্তাবে হিজবুল্লাহ বাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন থেকে লিতানি নদীর ওপারে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উত্তর ইসরায়েলের নাহারিয়া শহরের শিক্ষক ওফ্রা এলবাজ বলেন, ‘আমি খুব খুশি যে ইসরায়েলি বাহিনী হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যা করেছে। আমি স্বস্তি অনুভব করছি। আমাদের সেনাবাহিনী বিশ্বের সেরা।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবিভ বুশিনস্কি মনে করেন, এক সপ্তাহ পর ৭ অক্টোবরের হামলার বার্ষিকী আসার পর ইসরায়েলিরা আবার বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এখনও ধরা পড়েননি, গাজায় অনেক জিম্মি এখনও আটক রয়েছেন এবং উত্তরের বহু বাসিন্দা এখনও বাড়ি ফিরতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা হিজবুল্লাহর নেতৃত্বকে নির্মূল করার ঘটনায় মুগ্ধ হয়েছি, তবে শিগগিরই আমরা বাস্তবতার মুখোমুখি হবো। তখন মানুষ আবার প্রশ্ন করবে, এখন কী? এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে?’