হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল সংঘাতে কঠিন সমীকরণে লেবাননের সেনাবাহিনী

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষিতে দেশটির সামরিক বাহিনী একটি অতি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। লেবাননের সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না, কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হলে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তারা এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।

সম্প্রতি লেবাননের সেনাপ্রধান জেনারেল জোসেফ আউন পার্লামেন্টের স্পিকার নবীহ বেরির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে লেবাননের সামরিক বাহিনীর অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়। তারা এ বিষয়ে একমত হন যে, লেবাননের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের ও হিজবুল্লাহর সংঘাতে সরাসরি জড়াবে না। তবে, লেবাননের সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে আসবে না এবং নিজ অবস্থান ধরে রাখবে।

দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান বজায় রাখা

সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সামরিক বাহিনীর এই অবস্থান মানে নয় যে তারা দক্ষিণ থেকে সম্পূর্ণ সরে আসবে বা লিটানি নদীর উত্তরে স্থানান্তরিত হবে। লিটানি নদী ইসরায়েলি সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইসরায়েলি বাহিনী যখন গত সপ্তাহে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করে তাদের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নেয়, তখন জেনারেল আউন সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। তবে এই প্রত্যাহার শুধু ব্লু লাইন বা ইসরায়েলি সীমান্তের কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ স্টেশন থেকে। সেখানে সেনাবাহিনী ইসরায়েলি গোলাবর্ষণের মুখে পড়েছিল।

লেবাননের সেনাবাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট: তারা সরাসরি সংঘাতে নামতে প্রস্তুত নয়। তবে তারা তারা দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হলে প্রতিরোধ করবে। গত কয়েকদিনে তারা ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের একটি আঘাতে ব্লু লাইন থেকে দূরে একটি সামরিক পোস্টে একজন সেনা নিহত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে লেবাননের সেনারা ট্যাংক থেকে গুলি চালিয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়।

এক সামরিক সূত্র জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর কমান্ড সেন্টার প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দক্ষিণে অবস্থান করা সেনাদের নির্দেশনা দিচ্ছে। তবে, আমাদের সক্ষমতা সীমিত আর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত।

সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা

লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট ২০১৯ সাল থেকেই দেশটির সামরিক বাহিনীর সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলেছে। এর আগেও বাহিনী বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং বর্তমানে তারা খাবার সহায়তাও পেতে জর্দানের মতো দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।

এক সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেন, ইসরায়েলের মেরকাভা ট্যাংক এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর এম৪৮ ট্যাংকের মধ্যে তুলনা করার কোনও সুযোগ নেই। পার্থক্য বিশাল। তবুও, সেনাবাহিনী যদি আক্রমণের শিকার হয়, তারা নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনা। ছবি: রয়টার্স

এদিকে, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষে লেবাননে ইতোমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বেশিরভাগ হতাহতের ঘটনা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে ঘটেছে। ইসরায়েল ধারণা করছে, তারা দক্ষিণ লেবানন পুনরায় দখল করতে এবং হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে সরিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু হিজবুল্লাহ প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্ব মঞ্চে লেবাননের সেনাবাহিনীর অবস্থান

লেবাননের সেনাবাহিনীকে কীভাবে যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা যায় তা নিয়ে দেশটি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। হিজবুল্লাহ বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠন এবং লেবাননের সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

তবুও, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি লেবাননের ভবিষ্যৎকে এমনভাবে দেখতে চায় যেখানে দেশটির নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মহল থেকে জানা গেছে যে, মার্কিন সহায়তায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখতে একটি নীরব সমঝোতা রয়েছে। তারা ইসরায়েলের ওপর চাপ দিচ্ছে যাতে তারা লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হামলা না করে।

একই সময়ে, সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনগুলো থেকে নিজেকে পৃথক রাখতে সচেষ্ট এবং তা রাষ্ট্রীয় প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। এই সেনাবাহিনী দেশটির সব শ্রেণি ও ধর্মের লোকদের একত্রিত করে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব মেরোনাইট খ্রিস্টান হওয়া সত্ত্বেও বাহিনী কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়।

সামরিক বাহিনীর প্রতি আস্থা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বিশ্ব মঞ্চে লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর থেকে দেশটি কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। দুই বছর ধরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনও ঐক্যমতে পৌঁছানো যায়নি এবং বর্তমান সরকার দুর্বল ও সীমিত ক্ষমতায় কাজ করছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেবাননের সামরিক বাহিনীর প্রতি আস্থা এখনও অটুট। এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর বিদেশি অর্থায়নের কারণে সম্ভব হয়েছে। সেনাপ্রধান জোসেফ আউনের পশ্চিমা বিশ্বে ভালো অবস্থান রয়েছে এবং তিনি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারেন বলে জল্পনা রয়েছে।

লেবাননের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, সামরিক বাহিনী একধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাইছে না, আবার নিরপেক্ষতাও বজায় রাখছে না।

তবে, লেবাননের অনেকেই মনে করেন, এই যুদ্ধের পর সেনাবাহিনী দেশকে পুনর্গঠনের একটি সমাধান হয়ে উঠতে পারে। সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ ভূমিকা কী হবে, তা এই যুদ্ধে তাদের বর্তমান অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে।