‘আমার মেয়েরা ক্ষুধার কারণে তাদের আঙুল চুষে, আর আমি তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াই’, বললেন গাজা উপত্যকার বিধ্বস্ত তাঁবুতে বসবাসরত এক নারী ইয়াসমিন ইদ। দেইর আল-বালাহ’র শরণার্থী শিবিরে ইট দিয়ে বানানো চুলায় ছোট এক পাত্রে ডাল রান্না করছিলেন তিনি। এটিই ছিল বুধবার (২০ নভেম্বর) তাদের একমাত্র খাবার। এটাই তারা কিনতে পেরেছিলেন।
পাঁচবার স্থানচ্যুত হওয়ার পর, ইয়াসমিনের পরিবার এখন মধ্য গাজায় বসবাস করছে। কারণ এখানে ত্রাণ সংস্থাগুলোর উত্তরাঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি প্রবেশাধিকার রয়েছে। তবে উত্তর গাজা এখন অনেকটা বিচ্ছিন্ন। যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ধ্বংসের শিকার হয়েছে। অবশ্য গাজায় এখন প্রায় সবাই ক্ষুধার্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে পূর্ণমাত্রার দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে।
দেইর আল-বালাহ এলাকায় ইয়াসমিনের পরিবার হাজারো মানুষের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে। এ সপ্তাহে সেখানে স্থানীয় বেকারিগুলো পাঁচদিন বন্ধ ছিল। বুধবার সেখানে এক ব্যাগ রুটির দাম ১৩ ডলারের বেশি ছিল। তাও শেষ হয়ে গিয়েছিল দ্রুত।
জাতিসংঘের মানবিক দপ্তর জানিয়েছে, মধ্য ও দক্ষিণ গাজায় ভয়াবহ ক্ষুধার শিকার পরিবারের সংখ্যা ‘তীব্রভাবে বৃদ্ধি’ পেয়েছে। গত সাত সপ্তাহে ইসরায়েল গাজায় যে পরিমাণ খাবার প্রবেশ করতে দিয়েছে, তা পুরো যুদ্ধের মধ্যে প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
জাতিসংঘ ও সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চলাচলে বিধিনিষেধ, চলমান সংঘর্ষ, রাস্তার ক্ষয়ক্ষতি এবং ডাকাতিসহ বিভিন্ন বাধার কারণে গাজার ২৩ লাখ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ গাজায়,ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানের কাছাকাছি গত সপ্তাহে সশস্ত্র ব্যক্তিরা প্রায় ১০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক লুট করেছে। ইসরায়েল হামাসকে দায়ী করেছে, তবে এই ডাকাতি থামাতে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। অন্যদিকে হামাস বলছে, এটি স্থানীয় ডাকাতদের কাজ।
মাসের পর মাস ধরে ইয়াসমিন ও তার পরিবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে, আমরা কিছুই কিনতে পারি না। আমরা সবসময় রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমাতে যাই।’
গাজার বাজারে এখন এক কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ ডলার, মাঝারি আকারের একটি তেলের বোতলের দাম ১৫ ডলার। তবে সেগুলো পাওয়া কঠিন। মাংস ও মুরগি কয়েক মাস আগে থেকেই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। অবশ্য কিছু স্থানীয় সবজি পাওয়া যায় এখনও।
শত শত মানুষ দাতব্য সংস্থার খাবারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। কিন্তু দাতব্য সংস্থাগুলোর অবস্থাও এখন খারাপ হয়ে গেছে। যুদ্ধ চলাকালে জুইদা শহরের এক দাতব্য সংস্থা দৈনিক ৫০০ ডলার বাজেটে পরিচালিত হচ্ছিল। তখন তারা প্রতকিদিন ১০০০ পরিবারকে খাওয়াতে পারতো। কিন্তু অক্টোবরে গাজায় সহায়তা প্রবাহ কমে যাওয়ার পর, খরচ বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ১,৩০০ ডলার। এখন তারা অর্ধেক পরিবারকে খাওয়াতে পারে।
অক্টোবরে গাজায় প্রবেশ করা সহায়তার পরিমাণ ১,৮০০ ট্রাকে নেমে এসেছে, যা আগের মাসে ৪,২০০ ট্রাক ছিল। নভেম্বর মাসে প্রায় ২,৪০০ ট্রাক গাজায় প্রবেশের কথা রয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ ট্রাক প্রবেশ করত।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সহায়তা সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে আইন পাস করেছে। ইসরায়েলের অভিযোগ সংস্থাটি হামাস দ্বারা প্রভাবিত। তবে জাতিসংঘ তা অস্বীকার করেছে।
ইয়াসমিনের স্বামী হানি বলেন, ‘আমাদের যে কষ্ট হচ্ছে, তা বলতে আমার লজ্জা লাগে। আমি কী বলতে পারি? আমি একজন মানুষ, যার ২১ জন পরিবারের সদস্য রয়েছে। কিন্তু আমি তাদের জন্য এক ব্যাগ ময়দাও সরবরাহ করতে পারি না।’
যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনা চলছে। আর গাজার অধিকাংশ ফিলিস্তিনি বেঁচে থাকার জন্য খেয়ে না খেয়ে সংগ্রাম করছে।
সূত্র: এপি