আলেপ্পোতে হামলাকারী বিদ্রোহীরা কারা?

সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোতে বিদ্রোহীরা বুধবার সরকারবিরোধী বৃহত্তম অভিযান চালিয়েছে। রবিবার পর্যন্ত তারা শহরের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দক্ষিণের হামা শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এই আকস্মিক হামলার জেরে ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়া আলেপ্পোতে বিমান হামলা চালায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনী শহর থেকে তাদের বাহিনী সরিয়ে নেয়। হামলার নেতৃত্ব দেয় ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)। সিরিয়ার সংঘাতে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই গোষ্ঠীর।

পরিচয় ও ইতিহাস

এইচটিএসের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। তখন এটি ‘জাবহাত আল-নুসরা’ নামে আল-কায়েদার সরাসরি সহযোগী হিসেবে কাজ করত। ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি এটি গঠনে ভূমিকা রাখেন।

প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধীদের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম কার্যকর ও বিপজ্জনক গোষ্ঠী। তবে তাদের জিহাদী মতাদর্শ প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ায় তারা মুক্ত সিরিয়ার ব্যানারে থাকা মূল বিদ্রোহী জোটের সঙ্গে মতানৈক্যে জড়ায়।

২০১৬ সালে গোষ্ঠীর নেতা আবু মোহাম্মদ আল-জাওলানি আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং নতুন সংগঠন গঠন করেন। পরে এই গোষ্ঠী অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত হয়ে ২০১৭ সালে হায়াত তাহরির আল-শাম নামে পরিচিতি পায়।

সিরিয়ায় বর্তমান ক্ষমতার ভারসাম্য

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ গত চার বছর ধরে অনেকটাই স্থবির। প্রেসিডেন্ট আসাদ দেশটির প্রধান শহরগুলোর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবে দেশের পূর্বাঞ্চলের কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমের ইদলিব প্রদেশ এখনও সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

উত্তরের ইদলিব বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। এই অঞ্চলেই এইচটিএস সবচেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে অবস্থান করছে। তবে বিদ্রোহীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তাদের অবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

আলেপ্পোতে বিদ্রোহীদের আকস্মিক হামলা

২০১৬ সালে বিদ্রোহীরা আলেপ্পোতে বড় ধরনের পরাজয়ের শিকার হয়। রুশ বিমান হামলা ও ইরানি মদতপুষ্ট হিজবুল্লাহ মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সহায়তায় আসাদের বাহিনী শহরটি পুনর্দখল করে।

সম্প্রতি গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলের অভিযানের ফলে হিজবুল্লাহর শক্তি কমে যাওয়ায় এইচটিএস আলেপ্পোতে আকস্মিক হামলা চালানোর সুযোগ পায়। ইদলিবে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করার পরও এইচটিএস তাদের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে পরিষ্কার সংকেত দেয়নি।

বিদ্রোহীদের আঞ্চলিক ক্ষমতা

এইচটিএস তাদের কার্যক্রম ইদলিব অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রেখেছিল। সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে মৌলবাদী ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করলেও আইএসের মতো বৃহৎ খিলাফত গঠনের চেষ্টা করেনি।

তবে তাদের এই হামলা সিরিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্যকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। রাশিয়া ও তুরস্কের ২০২০ সালের একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তির ফলে উত্তর-পশ্চিমের সংঘর্ষ অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

সংঘাতের নতুন মাত্রা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলেপ্পোতে এই বিদ্রোহী অভিযান গৃহযুদ্ধের স্থবিরতা ভাঙতে পারে। বিদ্রোহীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ইরান ও হিজবুল্লাহর দুর্বলতার কারণে সংঘাত নতুন রূপ নিতে পারে।

আন্তর্জাতিক মহল এই নতুন সংঘাতকে ঘিরে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে রাশিয়া ও তুরস্ক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে আসাদের সরকার এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই নতুন সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

সূত্র: বিবিসি