মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যে সিরিয়ার যুদ্ধ আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর অঞ্চলজুড়ে স্থিতাবস্থা বদলে গেছে। এরই মধ্যে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণ সেই উত্তেজনার আরও বৃদ্ধি করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন এক প্রতিবেদনে বিদ্রোহীদের আক্রমণ ও সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে তুলে ধরেছেন।
আসাদের শাসন ও তার মিত্রদের ভূমিকা
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর সিরিয়ায় শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ তার ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রস্তুত ছিলেন যে কোনও মূল্যে। নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে তিনি রাশিয়া, ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সহযোগিতা নিয়েছেন। এই মিত্ররা তাকে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা করেছে।
বর্তমানে ইরান ও দেশটির মিত্র হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ক্রমাগত আক্রমণে দুর্বল। রাশিয়া বিদ্রোহীদের প্রতিহত করতে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তবে তাদের সামরিক শক্তির বড় অংশই ইউক্রেন যুদ্ধে নিয়োজিত।
বিদ্রোহীদের নতুন অভিযান
বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে থাকা হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) সম্প্রতি ইদলিব থেকে অভিযান শুরু করে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীকে হতবাক করে দিয়েছে। তারা মাত্র কয়েকদিনে আলেপ্পোর ঐতিহাসিক দুর্গ দখল করেছে। এই দুর্গ ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সরকারি বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া ছবিগুলোতে আলেপ্পোর পরিস্থিতি আপাতত শান্ত দেখালেও বিদ্রোহীদের সাফল্য বিশাল। তারা সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও সরঞ্জাম দখল করেছে এবং দামেস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এইচটিএসের রূপান্তর ও সমালোচনা
এইচটিএস একসময় আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত ছিল। যদিও ২০১৬ সালে তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে। বর্তমানে তারা নিজেদের ‘জিহাদি’ পরিচয় থেকে সরে এসে সাধারণ সিরীয়দের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে। তাদের সাম্প্রতিক অভিযানকে ‘অপারেশন রেপেলিং দ্য অ্যাগ্রেশন’ নাম দেওয়া হয়েছে, যা জিহাদি ভাষা বা ধর্মীয় উগ্রতার উল্লেখ এড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
সিরিয়ায় এই নতুন যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত গেইর পেডারসেন সাম্প্রতিক সংঘাতকে সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছেন।
পেডারসেন ২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত রেজুলিউশন ২২৫৪ অনুসারে সিরিয়ায় একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
আসাদের ভবিষ্যৎ
যদিও বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সাফল্য চমকপ্রদ, আসাদ সরকারকে এখনই অস্বীকার করা ঠিক হবে না। তার সরকারের প্রতি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির সমর্থন এখনও বিদ্যমান। অনেক সিরীয়ই বিদ্রোহী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় আসাদের শাসনকে মন্দের ভালো হিসেবে দেখেন।
তবে অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান আসাদের শাসনের জন্য আবারও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সিরিয়ার পরিস্থিতি নতুন করে সংঘাতময় হয়ে উঠেছে, যা আঞ্চলিক শান্তির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।