বিদ্রোহীদের দখলে সিরিয়া, হুমকির মুখে রুশ ঘাঁটি

ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) সিরিয়া দখলে নিয়েছে। রবিবার (৮ ডিসেম্বর) রাশিয়ার যুদ্ধ ব্লগাররা সতর্ক করেছেন, এতে করে দেশটিতে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি রুশ সামরিক স্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর উপস্থিতি হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবর জানিয়েছে।

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা নেওয়ার আগেই ইউক্রেনের আরও এলাকা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে মস্কো বাহিনী। তাই দেশটির সামরিক সংস্থানের অধিকাংশই ইউক্রেনে ব্যবহার করেছে রাশিয়া। আর এ জন্য সিরিয়ার স্থল পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে ২০১৫ সালের তুলনায় রাশিয়া এবার অনেক বেশি সীমিত ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। তখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে সমর্থন করার জন্য চূড়ান্তভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল মস্কো।

বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রগতি মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভূমধ্যসাগর জুড়ে ও আফ্রিকায় এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে দেশটির ক্ষমতাকে দুর্বল করার হুমকির মধ্যে ফেলেছে। এছাড়া, বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি একটি বিব্রতকর ধাক্কা মোকাবিলার ঝুঁকিতেও ফেলেছে। কেননা, মস্কো কীভাবে এই অঞ্চলের ঘটনাগুলোকে রূপ দিতে ও পশ্চিমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে এর উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপকে তুলে ধরতেন পুতিন।

রুশ যুদ্ধ ব্লগারদের কেউ কেউ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ এবং তাদের রুশ কর্তৃপক্ষ সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেশি কথা বলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তারা বলেছেন, সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি হলো, সিরিয়ার লাতাকিয়া প্রদেশে রাশিয়ার হামিমিম বিমানঘাঁটির ভবিষ্যত ও উপকূলে এর টারতুস নৌ সুবিধার জন্য।

টারতুস সুবিধা হলো রাশিয়ার একমাত্র ভূমধ্যসাগরীয় মেরামত ও পুনঃপূরণ কেন্দ্র এবং আফ্রিকায় মস্কোর সামরিক ঠিকাদারদের আনা-নেওয়া করার জন্য সিরিয়াকে একটি স্টেজিং পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করেছে দেশটি।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী রুশ যুদ্ধ ব্লগার ‘রাইবার’ এর টেলিগ্রামে ১৩ লাখেরও বেশি অনুসারী রয়েছে। তিনি বলেছেন, মস্কোর বাহিনী একটি গুরুতর হুমকির সম্মুখীন হয়েছে৷

রাইবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ‘বাস্তব অর্থে আমাদের বুঝতে হবে যে, বিদ্রোহীরা থামবে না।’

তিনি বলেন, সিরিয়াতে ‘তারা রুশ ফেডারেশনের প্রতিনিধিদের সর্বোচ্চ পরাজয় এবং সর্বাধিক সুনাম ও শারীরিক ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করবে। বিশেষ করে আমাদের সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার।’

শুধু সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট ছিল না বলে জানান তিনি।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অফিস সময়ের বাইরে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে রয়টার্স। দামেস্কের রুশ দূতাবাস রুশ নাগরিকদের সিরিয়া ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

শনিবার দোহায় রুশ ঘাঁটির ভাগ্য নিয়ে জানতে চাওয়া হলে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছিলেন, কি ঘটবে তা ‘আন্দাজ করে কিছু বলার মতো ব্যক্তি তিনি নন।’ তবে তিনি বলেছিলেন, মস্কো ‘সন্ত্রাসীদের’ অবস্থান রোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।

তিনি বলেছিলেন, সিরিয়ার ঘটনাগুলো কীভাবে তার নিজের বা রাশিয়ার খ্যাতিকে প্রভাবিত করবে তা নিয়ে চিন্তিত নন তিনি। তবে সিরিয়ার জনগণের ভাগ্য নিয়ে তিনি চিন্তিত।

রুশ বিমান বাহিনী সরকারি বাহিনীকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে সহায়তা করছে। ক্রেমলিন বলেছে, এটি এখনও আসাদকে সমর্থন করে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার জন্য কী কী সাহায্য প্রয়োজন খতিয়ে দেখতে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে।

রাশিয়ার যুদ্ধ ব্লগার ‘ফাইটারবোম্বার’ এর ৫ লাখেরও বেশি অনুসারী রয়েছে। তিনি বলেন, সিরিয়ায় মস্কো বাহিনী খারাপভাবে উন্মোচিত হয়েছে এবং হামিমিম বিমানঘাঁটি হারানোর অর্থ হবে বিমান হামলা চালানোর ক্ষমতা হারানো। তিনি বলেছিলেন, সেখানে মস্কোর সক্ষমতার ৭৫ শতাংশ রয়েছে।

তিনি বলেছিলেন, ‘হামিমিম বিমানঘাঁটিসহ একটি বহুতল শিল্প প্রকল্প নয়। এটি একটি ক্ষেত্র যেটির ওপর হালকাভাবে একত্রিত বিল্ডিং রয়েছে, যেটি শত্রুর আর্টিলারি বা ড্রোন ফ্লাইট রেঞ্জের মধ্যে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘টারটাসের নৌঘাঁটির পরিস্থিতিও প্রায় একই রকম। অবশ্যই এটিকে রক্ষা করা ও দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যেতে পারে যদি কেউ থাকে এবং এটি করার মতো কিছু থাকে।

তবে এটি হয় একেবারেই কাজ করতে সক্ষম হবে না, বা খুব সীমিত উপায়ে কাজ করবে।’

তিনি সতর্ক করেছিলেন, যদি প্রয়োজন হয় তবে রাশিয়ার সব সামরিক সরঞ্জাম সম্পূর্ণ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি বলছিলেন, ‘অতএব সিরিয়ায় আমাদের বাহিনীর প্রধান কাজ হলো শত্রুদের লাতাকিয়ায় প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখা। এমনকি যদি আমাদের সাময়িকভাবে বাকি অঞ্চল ছেড়ে দিতে হয় তবুও।’

৬ লাখেরও বেশি অনুসারী রয়েছে যুদ্ধ ব্লগার ‘স্টারশে এডি’র। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় পা রাখার জন্য রাশিয়াকে একটি ভারী মূল্য চুকাতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সেখানে দশটি বছর মৃত রুশ সেনা, বিলিয়ন রুবল ও হাজার হাজার টন গোলাবারুদ খরচ হয়েছে। তাদের অবশ্যই কোনও না কোনওভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’

তিনি বলছিলেন, এটি ‘আমাদের বর্তমান ব্যর্থতার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ দিতে পারে এবং আমরা যে সংস্থানগুলো ব্যবহার করেছি তা হলো লাতাকিয়া ও টারতুস প্রদেশগুলোকে ধরে রাখা।’

একজন বিশিষ্ট সাবেক রুশ মিলিশিয়া কমান্ডার ইগর গিরকিন। তিনি ইউক্রেনে যুদ্ধ করেছিলেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন ও সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের ভুলের জন্য দোষারোপের পর চার বছরের জেলও খেটেছেন। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় মস্কোর অবস্থান সর্বদা একটি দিক থেকেই উন্মোচিত হয়েছে—শক্তিবৃদ্ধি ও সরবরাহের দৃষ্টিকোণ।

তিনি কারাগার থেকে লিখেছেন, ‘আমরা যখন ইউক্রেনীয় ফ্রন্টে ব্যস্ত স্বাভাবিকভাবেই তখন আমাদের শত্রুরা এখন সেই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তিনি বলছিলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত প্রসারিত। সিরিয়ার পরাজয়ও আমাদের পরাজয় হবে।’