যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারমাণবিক চুক্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে যাচ্ছে ইরান। এক শীর্ষ ইরানি কূটনীতিক ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাব একতরফা এবং অযৌক্তিক। এতে তেহরানের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে।
রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তেহরানের পারমাণবিক আলোচনাকারী দলের ঘনিষ্ঠ ওই কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাবে ইরান একটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া খসড়া করছে, যা মূলত প্রত্যাখ্যান হিসেবেই ধরা যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাব শনিবার তেহরানে এসে পৌঁছে দেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আল বুসাইদি। কয়েক মাস ধরেই ওমান এই আলোচনা প্রক্রিয়ার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
এই প্রস্তাবে মূলত ইরানকে চূড়ান্তভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এমনকি তাদের বিদ্যমান উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সম্পূর্ণভাবে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
কিন্তু তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যেই পরিচালিত, এবং এটি একটি সার্বভৌম অধিকার।
একজন ইরানি কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্পর্কেও কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। ফলে এটি ইরানের স্বার্থ রক্ষা করে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান শিগগিরই প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক জবাব দেবে।
হোয়াইট হাউজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পাঠানো প্রস্তাব বাস্তবসম্মত এবং ইরানের স্বার্থেই এটি গ্রহণ করা উচিত।
তবে হোয়াইট হাউজ আরও জানিয়েছে, চলমান আলোচনার প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করবে না।
২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ছয় পরাশক্তির করা ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তার দ্বিতীয় মেয়াদে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পর, তিনি আবারও সর্বোচ্চ চাপ কৌশল শুরু করেন।
এই নিষেধাজ্ঞায় ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় তেল কোম্পানি, এমনকি বিমান ও বন্দর খাত—সবই অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বা অস্ত্র বিস্তারে সহায়তা করছে।
তেহরান বলছে, তারা সমৃদ্ধকরণে কিছু সীমাবদ্ধতা মানতে রাজি। তবে চায় নিশ্চিত গ্যারান্টি। যুক্তরাষ্ট্র যেন ভবিষ্যতে আবার চুক্তি থেকে সরে না যায়।
দুই ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জব্দ করা তহবিল মুক্ত করে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে তেহরানের শান্তিপূর্ণ অধিকার স্বীকার করে, তাহলে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে বৃহত্তর চুক্তির পথ তৈরি হতে পারে।
তেহরানের আঞ্চলিক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েল বহুবার হুমকি দিয়ে বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে থাকলে তারা সামরিক হামলা চালাতে পারে।
তবে আরাঘচি কায়রোতে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমি মনে করি না, ইসরায়েল এমন ভুল করবে যে তারা ইরানে হামলা চালাবে।
সম্প্রতি ইরান ও তাদের মিত্র—হিজবুল্লাহ, হামাস, ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়ারা—মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে সামরিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে আঞ্চলিক প্রভাব কিছুটা কমলেও, পারমাণবিক নীতিতে তারা অবস্থান দৃঢ় রেখেছে।
এদিকে, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গত এপ্রিল মাসে ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দেন—যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা না করলে, তা যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পারমাণবিক আলোচনায় ইরানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পারমাণবিক আলোচনাবিষয়ক কমিটি। ওই কূটনীতিক জানান, কমিটির মূল্যায়ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব একতরফা এবং ইরানের জন্য কোনও কার্যকর ফল বয়ে আনবে না।
তার কথায়, এটি একটি অগ্রহণযোগ্য চাপের কৌশল, যা খারাপ চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। ফলে তেহরান এটিকে ‘নন-স্টার্টার’ বা আলোচনার অযোগ্য বলেই বিবেচনা করছে।