ইরানের ঐতিহাসিক রাজধানী তেহরান এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এক হাজার বছরের পুরনো এই শহরটি অতীতে অনেক যুদ্ধ দেখলেও বর্তমান পরিস্থিতির মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন কখনও হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে গত আট দিনে শহরজুড়ে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তাতে তেহরান এক বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান-এর তথ্যমতে, গত আট দিনে ইরানে অন্তত ৭০৫টি স্থানে হামলা হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশই রাজধানী তেহরানে। বিশ্লেষকরা একে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের নেতৃত্ব নির্মূল কৌশল হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধের শুরুতেই ৩০টি বোমা-ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে তেহরানভিত্তিক সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।
সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি ডিপো, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্টেডিয়াম এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও আঘাত হেনেছে এই হামলা। ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য ‘গোলেস্তান প্যালেস’ হামলার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার রাতে রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলে একটি তেল শোধনাগারে হামলার ফলে জ্বালানি স্থাপনায় বড় ধরনের আগুন লেগে যায়। এক বাসিন্দা জানান, বিস্ফোরণে তার অ্যাপার্টমেন্টের জানালা কেঁপে ওঠে এবং তিনি দূরে আগুনের বিশাল লেলিহান শিখা দেখতে পান।
মানবাধিকার কর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-র বেশি ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, তারা কেবল সামরিক সদর দফতর, কমান্ড সেন্টার এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু এসব স্থাপনা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
১৭ মিলিয়ন মানুষের এই মহানগরীর ব্যস্ত সড়কগুলো এখন প্রায় ফাঁকা। সামর্থ্যবানরা শহর ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা রয়ে গেছেন, তাদের কাছে বিস্ফোরণ এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে তেহরানবাসীরা এখন রাতে ভবনের ছাদে জড়ো হয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের আলো আর বিমান হামলা দেখেন। এক নারী এই পরিস্থিতিকে ‘অদ্ভূত পিকনিক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘মানুষ ছাদে বসে খাবার খাচ্ছে আর একে অপরকে জিজ্ঞেস করছে ক্ষেপণাস্ত্রটি ঠিক কোথায় পড়ল।’
বাইরে যখন হামলা চলছে, শহরের ভেতরে তখন ইসলামি শাসনব্যবস্থার কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা এবং বাসিজ মিলিশিয়ারা সাধারণ মানুষের ওপর নজর রাখছে। রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। দোকানে চুরি বা লুটপাট ঠেকাতে দোকানদারদের সন্ধ্যার আগেই ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ছবি তুললে তাকে ‘ইসরায়েলি গুপ্তচর’ হিসেবে গণ্য করার সতর্কতা সংকেত পাঠানো হচ্ছে মোবাইল ফোনে।
ইরানের পুলিশ প্রধান আহমাদ-রেজা রাদান এক বার্তায় লুটপাটকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের প্রতি কোনও আপস না করার ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী তেহরানে হামলা চালিয়েছিল। ১৯৮৬ সালে পুরো এক বছরে বিমান হামলায় তেহরানে ৪২২ জন মারা যান। ১৯৮৮ সালে ৫২ দিনে ১১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ আগের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, ‘৮০-র দশকে যুদ্ধ ছিল দুই আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে। কিন্তু এখন ইরান একাধারে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসরায়েলের মুখোমুখি।’
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ৫০০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, যা ইতিহাসের যেকোনও সময়ের চেয়ে দ্রুততম ও বিধ্বংসী।
এদিকে ইরানের শিক্ষক সমিতি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন হাসপাতাল ও স্কুলগুলোকে যুদ্ধমুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী বেসামরিক স্থাপনার ভেতরে অবস্থান করায় সেসব জায়গাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। গত বৃহস্পতিবার বেসাত স্টেডিয়ামে একটি হামলার পর সেখানে ইরানি স্পেশাল ফোর্সের সদস্যদের আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
অর্থনৈতিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে তেহরান। নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। তেহরানের এক বাসিন্দা বলেন, ফলের দোকান থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সেখানে হামলা হলো। এখন বাজারে যাওয়া মানেই মৃত্যুভয় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া।