ইরানের শাসক পরিবর্তনে ইসরায়েলি প্রত্যাশা পূরণ হবে?

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ-এর প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে দেশটিতে একটি গণ-অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করতে চাইছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে ইরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষকে হত্যার জন্য এই দুই কর্মকর্তাকে দায়ী মনে করা হয়। ইসরায়েলের ধারণা, এই দুই প্রতাপশালী নেতার বিদায়ের ফলে বিক্ষোভ দমনে যে নৃশংসতা চালানো হতো, তা নিয়ে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে ভীতি কমবে এবং তারা পুনরায় রাজপথে নামার সাহস পাবে।

বুধবার সকালে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘোষণা করেছেন যে, রাজধানী তেহরানে এক নৈশ বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাঈল খাতিবও নিহত হয়েছেন। একই দিনে দক্ষিণ ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে একটি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই এই অভিযান চালানো হয়েছে।

আগামী শুক্রবার ইরানি নববর্ষ ‘নওরোজ’ উপলক্ষে এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানিদের রাজপথে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আমরা এই স্বৈরাচারের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে নির্মূল করেছি। সাহসী ইরানি জনগণ যেন ফেস্টিভ্যাল অব ফায়ার উদযাপন করতে পারে, সে জন্য আমাদের বিমানগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। তাই বাইরে বেরিয়ে উৎসব করুন, আমরা ওপর থেকে নজর রাখছি।

শাসক পরিবর্তনের বিষয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছুটা বিপরীতমুখী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সৌদি আরবের আল হাদাথ টিভি দাবি করেছে, একটি যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরানের সরকার পতনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আল-মনিটরের সঙ্গে আলাপকালে ইসরায়েলের এক কূটনৈতিক সূত্র ভিন্ন কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সরকার ভেঙে পড়ার কোনও লক্ষণ আমরা দেখছি না। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই বিকল্প আছে। ইরান একজন ব্যক্তির মাধ্যমে নয়, বরং একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে চলে।

তবে ওই সূত্রটি স্বীকার করেছেন যে, এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ইরানের নেতৃত্বের সংহতি নষ্ট করছে। তিনি বলেন, এখন যারা দেশ চালাচ্ছেন, তাদের আগের মতো অভিজ্ঞতা নেই। বিশাল এই ব্যবস্থার ভেতরে এটি একটি নতুন ফাটল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, একসময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আলী লারিজানিকে এমন একজন নেতা হিসেবে ভাবত যার সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা সম্ভব। একজন সাবেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, তিনি ছিলেন একজন রাসভারী মানুষ, দর্শনে পিএইচডি এবং কান্ট-এর দর্শনে অগাধ জ্ঞান ছিল তার। তিনি জানতেন পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়। লারিজানির সঙ্গে রাশিয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলের সীমা নির্ধারণের মতো চুক্তি হতে পারত বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু এখন লারিজানি নিহত হওয়ায় সে সম্ভাবনা চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।

বাসিজ প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বাসিজের সদরদপ্তরগুলো ধ্বংস হওয়ার পর সোলাইমানি তেহরানে একটি তাঁবুতে ৩০ জন সহযোগীর সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে আটটি বোমা ফেলে তাদের হত্যা করা হয়।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, বাসিজ সদস্যদের মধ্যে দলত্যাগ বা পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তবে তা এখনও ব্যাপক রূপ নেয়নি। এক কর্মকর্তা বলেন, গেম-চেঞ্জার তখনই হবে যখন রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) মধ্যে বড় ধরনের দলত্যাগ ঘটবে। অন্যদিকে, কুর্দিরা এখনই এই লড়াইয়ে নামার কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যদি ভেতর থেকে অভ্যুত্থান শুরু হয়, তবেই তারা যোগ দিতে পারে।

ইসরায়েল মনে করছে, ইরানে ধ্বংস করার মতো আরও পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহের লক্ষ্যবস্তু তাদের হাতে রয়েছে। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের ভয়, সব স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার পর অস্তিত্ব রক্ষায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকেই সব মনোযোগ দেবে।

একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ইরান হয়তো যুদ্ধের শেষ হওয়ার অপেক্ষা করবে এবং পরে মরুভূমির কোনও গর্তে লুকিয়ে সামরিক মানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে একটি আকস্মিক পারমাণবিক পরীক্ষা চালাতে পারে। যদি তেমনটা ঘটে, তবে আমরা এক নতুন মধ্যপ্রাচ্য ও নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হব। আমাদের আশা করতে হবে যেন পরিস্থিতি সেখানে না গড়ায়।