যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ‘উত্তেজনা বাড়ানোর প্রস্তুতি’?

যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ফিরে আসার যে কূটনীতি শীতল যুদ্ধের সময় ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করত, বর্তমানের অস্থিতিশীল সময়ে তা যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় শক্তির মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখা আর মারণাস্ত্রের প্রসারে বিশ্ব আজ খাদের কিনারে শুধু নয়, বরং মুক্ত পতনের কবলে। ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন (১ হাজার ২৭০ কোটি) ডলার। পরিস্থিতি সামাল দিতে পেন্টাগন এখন আরও ২০০ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বরাদ্দ খুঁজছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে এমন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা একসময় ইরান বা রাশিয়ার কল্পনা ছিল। কাতারের গর্ব হিসেবে পরিচিত বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি প্ল্যান্ট রাস লাফান আগামী পাঁচ বছরের আগে পুরোপুরি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এতে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হবে। বাহরাইন থেকে আবুধাবি পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ডিপোগুলো এখন ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোনের নিশানায়।

ভয়াবহ এই সংঘাতের মানবিক মূল্যও কম নয়। কেবল ইরানেই ১৮ হাজার বেসামরিক নাগরিক আহত এবং ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াইরত তেহরান আগেই সতর্ক করেছিল যে, আক্রান্ত হলে তারা এ অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে। তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানি হামলার মুখে পড়েন, তখন তাকে বেশ অবাক হতে দেখা যায়। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি বলেছিলেন, ‘আমেরিকানদের জানা উচিত, তারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তবে এবার তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে।’

ইরান আরও জানিয়েছিল, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে যুদ্ধের নতুন পর্যায় শুরু হবে। হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি স্পষ্ট করেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়া তাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। বুধবার যখন ইরান রাস লাফানে আঘাত হানে, তখন তেহরানে লারিজানির জন্য ‘শহীদি জানাজা’র আয়োজন চলছিল।

ইরানি শাসকগোষ্ঠীর যুদ্ধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে কোনও দ্বিধা নেই। একজন ইরানি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, উপযুক্ত সময়ে আমাদের অন্য কার্ড গুলো ব্যবহার করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির প্ল্যান্টগুলোকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুসংস্থানের প্রাণকেন্দ্র।

ইরানের এই বেপরোয়া মনোভাব ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আশঙ্কা করছেন, ইরান ভেঙে পড়লে সেখান থেকে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ঢল নামবে এবং ইউরোপ অর্থনৈতিক মন্দায় পড়বে। তিনি সীমান্ত বন্ধ করার প্রস্তুতির কথা বলেছেন।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুব্ধ দেখা যাচ্ছে। তিনি তার ইউরোপীয় মিত্রদের ‘দ্বিধাগ্রস্ত ও অকৃতজ্ঞ’ বলে গালি দিচ্ছেন। এমনকি নিজ প্রশাসনের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর তুলসি গ্যাবার্ড এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ওপরও তিনি অসন্তুষ্ট। গ্যাবার্ড কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো পুনর্নির্মাণ করছে না, যা ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীত।

জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি দলের নেতা টিনো ক্রুপাল্লা মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্প শান্তির প্রেসিডেন্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করবেন যুদ্ধের প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতা এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কে ফাটল ধরাচ্ছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, তাকে জানানো হয়নি। পরে তিনি বলেন, ‘আমি নেতানিয়াহুকে বলেছিলাম এটা করো না। আমাদের মধ্যে সমন্বয় আছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে সে এমন কিছু করে যা আমার পছন্দ হয় না।’ এর আগে ইসরায়েল তেহরানের চারটি বড় জ্বালানি ডিপোতে বোমা হামলা চালায়, যার ফলে শহরটিতে ‘কালো বৃষ্টি’ ঝরেছিল।

কূটনীতি এখন সম্পূর্ণ স্থবির। তেহরানের ব্রিটিশ দূতাবাসে এখন শুধু একটি তিন ঠ্যাংওয়ালা কুকুর ছাড়া কেউ নেই। বিশ্লেষকরা যুদ্ধের তিনটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভাবছেন। সেগুলো হলো, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শেষে ইরানের আত্মসমর্পণ, ট্রাম্পের একতরফা বিজয় ঘোষণা এবং যুদ্ধ থেকে সরে আসা এবং একটি আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা।

সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব সাইমন ম্যাকডোনাল্ড মনে করেন, ইসরায়েলি বিজয় অসম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু সারাজীবন ইরান নিয়ে আচ্ছন্ন ছিলেন। চার্চিল যেমন ১৯৩০-এর দশকে নাৎসি জার্মানির হুমকি বুঝতে পেরেছিলেন, নেতানিয়াহুও ইরানকে সেভাবে দেখেন। এটি তার আজীবনের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হতে পারে।’

অন্যদিকে, ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের আসলি আয়দিনতাসবাস মনে করেন, ইরানি শাসনে পরিবর্তন এলেও তা আরও কট্টরপন্থার দিকে গেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মতে, লারিজানির মতো ব্যক্তিদের হত্যাকাণ্ড শান্তির সম্ভাবনাকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরান যদি মনে করে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে অক্ষম, তবে তারা ভুল হিসাব করেছে। তিনি বলেন, ‘আগে যেটুকু বিশ্বাস ছিল, তা এখন পুরোপুরি চুরমার হয়ে গেছে।’