ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তেহরানের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় একের পর এক হামলার প্রেক্ষাপটে তুরস্ক ও আরব দেশগুলো একে অপরের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় আগের চেয়ে অনেক বেশি কাছাকাছি আসছে। তবে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে ন্যাটোর মতো কোনও আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা এখনও সুদূরপরাহত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর এ খবর জানিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ও তেল শোধনাগারগুলোতে ইরানি হামলা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত বুধবার কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে ইরানের হামলায় দেশটির এলএনজি রফতানি সক্ষমতা ১৭ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে বার্ষিক প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এসব হামলার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আঙ্কারার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা, একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর আলী বাকির বলেন, ‘তুরস্কের উচিত উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর আরও বাড়ানো।’ তার মতে, এই যুদ্ধ তুরস্ক ও উপসাগরীয় রাজধানীগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে ত্বরান্বিত করবে।
ইতোমধ্যে আঙ্কারা ও দোহার মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও জোরদারে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। কাতারে তুরস্কের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৩ হাজার সেনা মোতায়েন আছে।
সৌদি আরবের সঙ্গেও তুরস্কের সম্পর্ক এখন কেবল কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ৩ বিলিয়ন ডলারের আকিনজি ড্রোন চুক্তি এবং ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা চলছে। এমনকি রিয়াদ তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের কেএএএন স্টিলথ ফাইটার প্রোগ্রামে অংশীদার হতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের সঙ্গেও ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির বিষয়ে বড় ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে তুরস্ক।
ন্যাটোর মতো জোট কি সম্ভব?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মডেলে একটি আঞ্চলিক সংহতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘সেখানে কোনও তুর্কি আধিপত্য থাকবে না, থাকবে না কোনও আরব বা পারস্য আধিপত্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি শূন্য থেকে শুরু করে আজ এখানে আসতে পারে, তবে আমরা কেন পারব না?’
আলী বাকির মনে করেন, দুর্বল ইরান এবং আঞ্চলিক আধিপত্যে মরিয়া ইসরায়েলের মাঝে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপ জরুরি। তবে গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের ফেলো সিনেম চেঙ্গিজ কিছুটা সতর্ক। তিনি বলেন, ‘আমরা কি কোনও জোট গঠিত হতে দেখছি? সম্ভবত কোনও সামরিক জোট নয়, বরং স্পষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সমন্বয় তৈরি হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ন্যাটোর মতো জোট গঠনের পথে প্রধান বাধা হলো দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত অগ্রাধিকার। সৌদি আরব যেখানে আঞ্চলিক নেতৃত্ব চায়, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত চায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। আবার ওমান বরাবরই নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে পছন্দ করে। এছাড়া ন্যাটোর মতো কোনও সমন্বিত কমান্ড কাঠামো বা অভিন্ন সামরিক মতবাদও এই অঞ্চলে অনুপস্থিত।
সিনেম চেঙ্গিজের মতে, দেশগুলো আপাতত আনুষ্ঠানিক জোটের চেয়ে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক উন্নয়ন এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দেবে।