ইরানের ইস্পাহান শহরের অদূরে একটি সাদামাটা কারখানা। ওপর থেকে নেওয়া সাদাকালো ছবিতে দেখা যাচ্ছিল গাছপালা ঘেরা শান্ত এক চত্বর। কিন্তু দ্বিতীয় ছবিতে দৃশ্যপট পুরো ভিন্ন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি অনুযায়ী, ড্রোন তৈরির সেই কারখানাটি এখন স্রেফ ধ্বংসস্তূপ। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া কঙ্কাল আর ধ্বংসাবশেষ।
গত সপ্তাহে এই ছবিগুলো প্রকাশ করে সেন্ট্রাল কমান্ড একে ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের ওপর ‘বড় আঘাত’ হিসেবে দাবি করেছে। পারস্য উপসাগরীয় মিত্রদের তারা আশ্বস্ত করতে চেয়েছে যে জনবসতি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা শাহেদ ড্রোনের তাণ্ডব অচিরেই থামানো হবে।
কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হয়তো অসম্ভব। কারণ শাহেদ ড্রোন এমন এক সস্তা প্রযুক্তি, যা সাধারণ বাজার থেকে কেনা যন্ত্রাংশ দিয়ে ছোট ছোট ওয়ার্কশপেও তৈরি করা সম্ভব। স্টিমসন সেন্টারের ফেলো ম্যাক্সিমিলিয়ান ব্রেমারের ভাষায়, ‘এই প্রযুক্তির এখন বিকেন্দ্রীকরণ হয়ে গেছে। থ্রি-ডি প্রিন্টিং আর সাধারণ মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন দিয়ে যদি এটি বানানো যায়, তবে এর উৎস খুঁজে বের করা কঠিন।’
যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১ মার্চ যেখানে ইরান ৪০০টিরও বেশি ড্রোন ছুড়েছিল, এখন সেই হার কমে দাঁড়িয়েছে দিনে ৭০ থেকে ৯০টিতে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইয়াসির আতালান স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘যুদ্ধ চলতে থাকলে ইরান আরও বেশি ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম হবে।’
এই ড্রোনের সবচেয়ে বড় শক্তি এর খরচ ও বহনযোগ্যতা। মাত্র ৩৫ হাজার ডলার মূল্যের একেকটি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন মূলত একটি ধীরগতির ক্রুজ মিসাইল। এটি একটি সাধারণ পিকআপ ভ্যান থেকেও উৎক্ষেপণ করা যায়। ট্রাকে করে এটি বহন করার সময় স্রেফ একটা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখলেই তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
শাহেদ ড্রোনের এই উপদ্রব ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তারা একেকটি ড্রোন ভূপাতিত করতে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ছুড়ছে। ধীরগতির এই ড্রোনগুলো ভূপাতিত গিয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোকে নিজেদের গতি কমিয়ে প্রায় অচল হওয়ার উপক্রমে নামিয়ে আনতে হচ্ছে।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের পরিচালক ড্যামিয়েন স্প্লিটার্স ইরানের এই রণকৌশলকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘সরলতা, বাণিজ্যিক যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা এবং গুণের চেয়ে সংখ্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া।’
ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা পেতে পারে। ন্যাটোর সাবেক কর্মকর্তা গর্ডন বি ডেভিস জানিয়েছেন, রাশিয়া বর্তমানে দিনে ১ হাজারটি ড্রোন তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ডেভিসের মতে, ‘ইরান প্রচলিত পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জিততে চাইছে না। তারা সরাসরি লড়াইয়ের বদলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।’
এদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শাহেদ ড্রোন মোকাবিলায় সাহায্য করতে ২০০ জনের বেশি ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞ মধ্যপ্রাচ্যে এসেছেন। ইউক্রেন ইতোমধ্যে শিখেছে কীভাবে দামি প্যাট্রিয়ট মিসাইল খরচ না করে সস্তা ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের মাধ্যমে এই বিপদ ঠেকানো যায়।
ইরানের এই ড্রোন সক্ষমতা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খেলনা প্লেনের মতো সাধারণ রিমোট কন্ট্রোল বিমানে ক্যামেরা লাগিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০১৮ সালে সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে এবং ২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার মাধ্যমে এর বিধ্বংসী রূপ প্রকাশ পায়। ২০২২ সাল থেকে ইরান রাশিয়াকে এই ড্রোন সরবরাহ শুরু করে।
ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, ইরানের কাছে ঠিক কত হাজার ড্রোন এখনও লুকানো আছে? মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় উৎপাদনের মূল কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা চললেও ইয়াসির আতালান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এসব ড্রোন তৈরির জন্য খুব বড় স্থাপনার প্রয়োজন হয় না। বিকেন্দ্রীভূত উপায়ে এর উৎপাদন চললে তা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে।