ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে তেহরানের সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা হরমুজ প্রণালি শক্তি প্রয়োগ করে সচল করার পরিকল্পনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থলবাহিনীর আগমন ট্রাম্পের এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনার বাস্তব ভিত্তি দিচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। তবে এই পথে হাঁটলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই জলপথটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত রবিবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি প্রয়োজনে ইরানের তেলক্ষেত্রগুলো দখলে নিতে চান।
হরমুজ প্রণালি সচল করতে ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় কোনও ভূখণ্ড দখল করা, না হয় জলপথে বিশাল নৌবহর মোতায়েন করা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমিত পরিসরে স্থল অভিযান চালালেও যে পরিমাণ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে সংকটে ফেলতে পারে। ইরানের জন্য এটি একটি চূড়ান্ত সীমা।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এমা সালসবেরি বলেন, ‘ট্রাম্প সম্ভবত পারস্য উপসাগরের কোনও ইরানি দ্বীপ দখলের লোভ সামলাতে পারবেন না। কিন্তু আমার মনে হয় এটি ভয়াবহ ভুল হবে এবং প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটবে।’
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি পাঠিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, তাদের মাটিতে মার্কিন সেনা পা রাখলে তারা নিজেদের ভূখণ্ডেই কার্পেট বোম্বিং করবে। প্রয়োজনে নিজেদের অবকাঠামো উড়িয়ে দিয়ে হলেও আক্রমণকারী বাহিনীকে ধ্বংস করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তারা। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মুখে আলোচনার কথা বললেও আসলে স্থল হামলার ছক কষছে। তিনি বলেন, আমাদের সেনারা মার্কিনদের আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য অপেক্ষা করছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫ হাজার বিশেষায়িত মেরিন সেনা এবং ২ হাজার ছত্রীসেনা পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের প্রধান তেল রফতানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ হতে পারে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু। তবে আইআইএসএস-এর সিনিয়র ফেলো রুবেন স্টুয়ার্ট মনে করেন, কোনও দ্বীপ দখল করা সামরিকভাবে খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না। কারণ কয়েক দিনের বেশি সেখানে টিকে থাকা কঠিন হবে।
এ ছাড়া ট্রাম্প ইরানের উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভাণ্ডার দখলে নেওয়ার মতো আরও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের কথা ভাবছেন। তবে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় দেড় লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে ইরানের আয়তন ইরাকের তিন গুণেরও বেশি। সেই তুলনায় বর্তমানে মোতায়েন করা ৫০ হাজার সেনা একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের জন্য অত্যন্ত নগণ্য।
শুধু দ্বীপ দখল করলেই হরমুজ প্রণালি নিরাপদ হবে না। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রয়োজন হবে নৌ-এসকর্ট, মাইন অপসারণ এবং বিমান সহায়তা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজ নেই। ফলে তাদের যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। গত শনিবার তারা সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়ে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এখন তারা যদি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রক্ষার চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।