যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রের প্রভাব এখন ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও জ্বালানি বাজারে। তেহরান ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি প্রবাহের প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে যান চলাচল সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে। তবে এখন সবার নজর পশ্চিমের বাব আল মানদাব প্রণালির দিকে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই সরু অথচ অপরিহার্য জলপথটি এখন চরম অস্থিরতার মুখে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
গত শনিবার ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চলমান এই সংঘাতের মধ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল মানদাব প্রণালিকেও টেনে আনা হতে পারে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক করিডোর এখন সরাসরি যুদ্ধের হুমকির মুখে।
এশিয়ার আরব উপদ্বীপের ইয়েমেন এবং আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই বাব আল মানদাব প্রণালি। এটি উত্তরে সুয়েজ খাল এবং দক্ষিণে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি সরু সংযোগ তৈরি করেছে, যা মূলত ইউরোপ ও এশিয়ার বাণিজ্যের মূল ভিত্তি।
প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালিটি এর সংকীর্ণতম পয়েন্টে মাত্র ৩০ কিলোমিটার চওড়া। আরবিতে এর নাম বাব আল মানদাব, যার অর্থ দুঃখের তোরণ। কয়েক শতাব্দী ধরে এই পথে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং আফ্রিকা ও এশিয়াকে আলাদা করে দেওয়া এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের কিংবদন্তি থেকেই এই নামের উৎপত্তি। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খোলার পর এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ এটি আফ্রিকাকে প্রদক্ষিণ না করেই সরাসরি ইউরোপে পণ্য পৌঁছানোর পথ করে দেয়।
বাব আল মানদাব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে প্রতিদিন প্রায় ৯৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যা সমুদ্রপথে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ। বিশ্বে কেবল মালাক্কা প্রণালি (২৪ মিলিয়ন ব্যারেল) এবং হরমুজ প্রণালি (২১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল) দিয়ে এর চেয়ে বেশি তেল পরিবহণ করা হয়।
তবে ২০২৪ সালে হুথিদের হামলার কারণে এই প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে প্রতিদিন ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এর প্রভাব পড়ে সুয়েজ খালেও। জাহাজগুলো তখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলাচল করতে বাধ্য হয়। যদিও ২০২৫ সালের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু চলতি সপ্তাহে হুথিরা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সরাসরি ইরান-সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।
হুথি সরকারের উপ-তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ মনসুর আল-আরাবি টেলিভিশনকে বলেছেন, আমাদের পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত যাতে ইসরায়েল ও আমেরিকার ওপর চাপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তিনি জানান, চলমান যুদ্ধে লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর ও বাব আল মানদাবকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার বিকল্পগুলো তাদের হাতে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, বাব আল মানদাবে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি চরম সংকটে পড়বে। চ্যাথাম হাউসের ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি এক বিশ্লেষণে বলেছেন, এখানে কোনও বিঘ্ন ঘটা মানেই জাহাজের ভাড়া বেড়ে যাওয়া, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালির সংকটে জর্জরিত ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়া।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেলের দাম ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে, যা রেকর্ড মাসিক বৃদ্ধির পথে রয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের অ্যালিসন মাইনর মনে করেন, হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ থাকায় সৌদি আরব এখন এশিয়ায় তেল রফতানির জন্য লোহিত সাগরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তিনি বলেন, লোহিত সাগরের রুটটি না থাকলে আর কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধের পর উপসাগরীয় তেলের প্রবাহ পুরোপুরি থমকে যেতে পারে।
মাইনরের মতে, হুথিরা এখানে বিভিন্ন কৌশল নিতে পারে। তারা হয়তো ছোটখাটো হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের বিদ্যমান সমঝোতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে, অথবা রিয়াদের ভীতিকে পুঁজি করে নতুন কোনও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করবে। তবে ইয়েমেনের রুক্ষ উপকূলরেখা হুথিদের অস্ত্র লুকানোর প্রাকৃতিক সুবিধা দেয়। গত বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের অনেক শীর্ষ নেতা এবং অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস হলেও গোষ্ঠীটি পুনরায় সংগঠিত হয়েছে, যা জিবুতিতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ক্যাম্প লেমনিয়ার-এর জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড