ইরানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে ‘বিধ্বংসী’ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। পাল্টাপাল্টি এই উত্তেজনার মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান।
এক মাসের বেশি সময় আগে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার শিকার হচ্ছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ।
বুধবার রাতে হোয়াইট হাউজ থেকে দেওয়া ১৯ মিনিটের এক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের ‘খুব কাছাকাছি’ রয়েছে। তবে ইরান যদি আলোচনায় না বসে, তবে হামলা আরও তীব্র করা হবে। মার্কিন পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবো, যেখানে তাদের থাকা উচিত।’
ট্রাম্পের এই ভাষণের পরপরই ইরানের রাজধানী তেহরানের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কারাজের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বি-১ হাইওয়ে ব্রিজে বিমান হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানের ফার্স নিউজ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ এই সেতুটিতে হামলায় দুজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। উদ্ধারকারীরা যখন হতাহতদের সহায়তা করছিল, ঠিক এক ঘণ্টা পর সেখানে আবারও বিমান হামলা চালানো হয়। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) এই সেতুতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে আইডিএফ দাবি করেছে, তারা ইরানের সামরিক বাহিনীর অর্থায়ন ও অস্ত্র তৈরির কারখানা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর জন্য রাখা তহবিলের প্রধান কার্যালয়গুলোতে গত একদিনে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে।
ইরানও পাল্টা আঘাত হিসেবে রাতভর এবং বৃহস্পতিবার সকালে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। আইডিএফ জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান অন্তত ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যার অর্ধেকই প্রতিহত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছিল গুচ্ছবোমা সমৃদ্ধ, যা মধ্য ইসরায়েলের জনবহুল এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বেশ কয়েকজন আহত হন এবং সম্পদের ক্ষতি হয়।
ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার খাতাম আল-আনবিয়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছে, আরও ‘বিধ্বংসী, বিস্তৃত ও ধ্বংসাত্মক’ পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকতে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রেখে বলছি, তোমাদের আত্মসমর্পণ ও চূড়ান্ত অনুশোচনা না আসা পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং জনমত জরিপে পিছিয়ে পড়ায় ট্রাম্প সম্প্রতি যুদ্ধ বন্ধে চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ইরানের নতুন নেতৃত্বকে ‘অপেক্ষাকৃত কম কট্টর ও যৌক্তিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তেহরান ওয়াশিংটনের এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা পাওয়া গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনও আলোচনা হচ্ছে না। এর বিপরীতে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, চুক্তি না হলে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই সংকটের সমাধান ও নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে বৃহস্পতিবার ৩৫টি দেশের শীর্ষ সম্মেলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ব্রিটেন। বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাসকাল দোনোহো এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলি হামলায় ইরানের দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানা পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে। উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে। এর প্রতিশোধ নিতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইসরায়েলের শিল্পাঞ্চল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
এদিকে লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও ইসরায়েলের সংঘর্ষ চলছে। বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় এক শীর্ষ কমান্ডারসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে লেবাননে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল