মাত্র একদিনের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে অবস্থান পরিবর্তন করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ‘পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় তেহরানের দেওয়া এক পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে ১৪ দিনের একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়াল থেকে ভূমিকা রেখেছে চীনও। মঙ্গলবার ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এর মাধ্যমে আপাতত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা আমাদের সব সামরিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছি এবং আরও ছাড়িয়ে গেছি। এখন ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি স্থাপনের একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তির পথে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি।’ এই যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বুধবার হোয়াইট হাউজে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প।
কেন এই পিছুটান?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পিছুটানের পেছনে বড় কারণ হতে পারে ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ার ভয়। নির্বাচনি প্রচারের সময় তিনি বারবার অঙ্গীকার করেছিলেন, পূর্বসূরিদের মতো তিনি আমেরিকাকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবেন না।
যদিও শুরুতে ট্রাম্প ভেবেছিলেন শুধু বোমাবর্ষণ করেই ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে, কিন্তু তেহরান দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সংকেত দিচ্ছিল। গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে ইরান বারবার দেখিয়েছে যে তারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পিছু হটে না। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট থেকে শুরু করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ, মোল্লাতন্ত্র বরাবরই চরম মূল্য দিয়েও নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে।
হরমুজ প্রণালির জটিল সমীকরণ
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহকারী এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আমেরিকার জন্য খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু সেখানে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
অলাভজনক সংস্থা ব্যাটল রিসার্চ গ্রুপ-এর বেন কনাবল বলেন, হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত রাখতে হলে ইরান উপকূলের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার এলাকা মার্কিন পদাতিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এর জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ হাজার সেনার প্রয়োজন হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এটি একটি অনির্দিষ্টকালের অপারেশন হতে পারে। আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো ২০ বছর সেখানে থাকতে হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প হয়তো সরে এসেছেন।’
নতুন চুক্তির শর্ত ও সমালোচনা
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ফি বা টোল আদায় করতে পারবে। ইরান এই অর্থ পুনর্গঠন কাজে ব্যবহার করবে বলে জানানো হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় আগে কখনোই কোনও ফি দিতে হতো না।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প কার্যত তেহরানকে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দিয়েছেন, যা ইরানের জন্য একটি ঐতিহাসিক বিজয়। তিনি একে প্রেসিডেন্টের ‘অক্ষমতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সর্বোচ্চ দাবি থেকে সরে আসার পুরোনো অভ্যাস
ট্রাম্পের জন্য এটিই প্রথম পিছুটান নয়। এর আগেও তিনি বড় কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ‘দুই সপ্তাহ’ সময় নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ বা স্বাস্থ্যসেবা খাতের মতো বিষয়েও তিনি বারবার এমন সময়সীমা দিয়েছিলেন।
গত এপ্রিলে ঘোষিত লিবারেশন ডে শুল্কনীতি বা গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি থেকেও তিনি একইভাবে পিছিয়ে এসেছিলেন। প্রতিবারই তিনি দাবি করেন যে একটি ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির কাঠামো’ তৈরি হওয়ায় তিনি নমনীয় হয়েছেন।
তবে হোয়াইট হাউজ একে ট্রাম্পের জয় হিসেবেই দেখছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীর সাফল্যই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে। শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার সক্ষমতাকে কখনোই ছোট করে দেখা উচিত নয়।’
সূত্র: এপি