ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বুধবার বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস দেখা দিলেও তার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ প্রলয়ঙ্ককরী হুমকি থেকে পিছু হটার খবরটি বিশ্বনেতারা ইতিবাচকভাবে নিলেও, গত ছয় সপ্তাহের টালমাটাল পরিস্থিতি তাদের এক গভীর অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
বিশ্বনেতারা বলছেন, এই যুদ্ধ কেবল অর্থনীতি বা জ্বালানি সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং বিশ্বের শীর্ষ পরাশক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও ওলটপালট করে দিয়েছে। দুই সপ্তাহের এই বিরতি যদি স্থায়ী শান্তিতে রূপও নেয়, তবুও বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার যে ব্যাপক ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়েছে, তা মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
‘আগুন দিয়ে বালতি হাতে আসা’
যুদ্ধবিরতির এই খবরকে স্বাগত জানালেও ট্রাম্পের রণকৌশল নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় নেতারা। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই যুদ্ধের শুরু থেকেই কট্টর বিরোধী ছিলেন। তিনি এই চুক্তিকে ‘সুসংবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের নিন্দা জানিয়ে তিনি এক বার্তায় লিখেছেন, ‘সাময়িক স্বস্তি আমাদের বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস আর প্রাণহানির কথা ভুলিয়ে দিতে পারে না। যারা বিশ্বে আগুন লাগিয়ে দিয়ে এখন বালতি হাতে হাজির হয়েছে, স্পেন সরকার তাদের জন্য হাত তালি দেবে না। এখন যা প্রয়োজন তা হলো কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি।’
একই সুরে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘আজকের বিশ্ব কি গতকালের চেয়ে ভালো অবস্থানে? নিঃসন্দেহে। কিন্তু ৪০ দিন আগের চেয়ে কি ভালো? তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’
ট্রাম্পের ভাষা নিয়ে অস্বস্তি
ইউরোপের বাইরে ওমান, জাপান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ একে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কমার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে ট্রাম্প ইরানের ‘সভ্যতা শেষ করে দেওয়ার’ যে হুমকি দিয়েছিলেন, তার সমালোচনা করে অ্যালবানিজ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা মোটেও যথাযথ নয়।’
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, এখনকার মূল লক্ষ্য হতে হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানো। তিনি মনে করেন, এই আলোচনার মাধ্যমেই একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এড়ানো সম্ভব।
নীরবতার কূটনীতি ও প্রভাবহীন বিশ্বনেতারা
ট্রাম্পের খামখেয়ালি মেজাজ আর যুদ্ধংদেহী মনোভাব সামলাতে বিশ্বনেতারা এক প্রকার হিমশিম খাচ্ছেন। গত মঙ্গলবার যখন ট্রাম্প ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন ফ্রিডরিখ মের্ৎস, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কিংবা ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কেউই প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এক ধরনের ‘সচেতন নীরবতা’। ট্রাম্পকে প্ররোচিত না করে পর্দার আড়ালে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের কাজ করার সুযোগ করে দিতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। তবে বিশ্বনেতারা এটিও বুঝতে পেরেছেন যে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা তাদের অত্যন্ত সীমিত।
জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ধস সামাল দেওয়ার লড়াই
যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় ইউরোপের দেশগুলো বিপাকে পড়েছে। ইতালিতে জ্বালানি সংকটের কারণে স্কুলগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পুনরায় অনলাইন ক্লাসে ফেরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি রাজনৈতিকভাবে চাপের মুখে থাকায় জ্বালানি কর কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। জার্মানিও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিটি সাধারণ পরিবারকে এই বছর অতিরিক্ত ২ হাজার ৩০০ ডলার বা প্রায় ২ হাজার ইউরো জ্বালানি খরচ বাবদ গুনতে হবে। মিলানের বোকোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক টিটো বোয়েরি সতর্ক করে বলেন, ‘জ্বালানি অবকাঠামোর যে গভীর ক্ষতি হয়েছে, তাতে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফিরতে অনেক সময় লাগবে।’
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বুধবার পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক করতে রওনা দিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগেই এই সফর নির্ধারিত ছিল, যার লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্থায়ীভাবে নির্বিঘ্ন রাখা। তবে ৪০টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীদের আলোচনার পরও এখন পর্যন্ত কোনও পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হয়নি।