লেবানন ইস্যু নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধ সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। একটি ফোনালাপের সূত্র ধরে প্রকাশ্যে আসা এই বিরোধে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, নেতানিয়াহুর সামরিক লক্ষ্য এবং সম্ভবত তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব এখন এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ওপর নির্ভরশীল, যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়ানোর প্রতি যার কোনও আগ্রহ নেই।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কথা হয়। কিন্তু উভয়পক্ষের কর্মকর্তারাই জানতেন যে এমন একটি সময় আসবে যখন দুই মিত্রের স্বার্থ ও লক্ষ্য আলাদা হয়ে যাবে। নেতানিয়াহু শিবিরের অনেকেই এখন আশঙ্কা করছেন যে সেই সময়টি চলে এসেছে। স্বয়ং নেতানিয়াহু মঙ্গলবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কীভাবে শেষ হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তিনি এবং ট্রাম্প একমত কিনা, তা একটি ‘মীমাংসিত কিছু নয়’।
আগামী অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। অথচ নেতানিয়াহু হামাসকে ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি বা ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা কোনোটিই বাস্তবায়ন করতে পারেননি। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর ক্রমাগত হামলার কারণে দেশের ভেতরেই তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। সীমান্তে ড্রোনের সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গে নেতানিয়াহুর ওপর জবাব দেওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই তিনি বৈরুতে হিজবুল্লাহর লক্ষ্যবস্তুতে বড় ধরনের হামলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু একজন ক্ষুব্ধ ট্রাম্পের কারণে তাকে পিছু হটতে হয়েছে। লেবাননের চেয়ে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ট্রাম্প।
গত সোমবার এক ফোনালাপে ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহুকে তিরস্কার করেন এবং বৈরুতে হামলা বন্ধের নির্দেশ দেন, তখন তা ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় ধরনের ঝড় তোলে। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সরকারের কট্টরপন্থি মিত্রদের কেউ কেউ দাবি করেন যে নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে আমেরিকার ‘কলোনিতে’ পরিণত করেছেন এবং ট্রাম্পের কাছে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছেন।
লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের কারণে ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বর্জন করার এবং ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেয়, ঠিক তখনই ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই ফোনালাপটি হয়। এক ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, ‘সেটি ছিল একটি ভয়াবহ ফোনালাপ। ট্রাম্প সত্যিই বিবিকে (নেতানিয়াহু) চেপে ধরেছিলেন। লেবানন পরিস্থিতি এবং এর মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে আলোচনা যাতে ভেস্তে না যায়, সেজন্য তিনি বৈরুতে হামলার পরিকল্পনা থেকে অবিলম্বে পিছিয়ে আসার দাবি জানান।’
ট্রাম্প তাকে ‘পাগল’ বলেছেন কিংবা ট্রাম্পের সাহায্য ছাড়া তিনি এতদিনে জেলে থাকতেন, এমন দাবি অস্বীকার করেননি নেতানিয়াহু। এর পরিবর্তে তিনি সিএনবিসি-কে বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার আগেও তর্ক হয়েছে, তবে তাদের ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব সবসময় বজায় ছিল। একইভাবে ট্রাম্পও নিউ ইয়র্ক পোস্টের কাছে এই ফোনালাপের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি নেতানিয়াহুকে পছন্দ করেন এবং তার সঙ্গে ভালোভাবে কাজও করছেন বলে জানান।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই টানাপোড়েন হয়তো সাময়িক, কিন্তু ইরান যুদ্ধ শেষের প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের মধ্যকার মতপার্থক্য বেশ জটিল। দুই সিনিয়র মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প যেখানে যুদ্ধ শেষ করতে চান, সেখানে নেতানিয়াহু যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিবি মাঝে মাঝে ভুলে যান কখন থামতে হবে।’ বৈরুতে হামলার পরিকল্পনা দ্রুত বাতিল করা এবং সম্পর্কে ফাটলের ধারণা আড়াল করতে নেতানিয়াহুর তাড়াহুড়োই প্রমাণ করে যে তার সামরিক কোমল ও রাজনৈতিক অবস্থান কতটা ট্রাম্পের প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহলের একটি সূত্র জানায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আশঙ্কা করছেন যে এই উত্তপ্ত ফোনালাপের পর লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের স্বাধীনতায় আরও বিধিনিষেধ আসতে পারে। তেহরান বা বৈরুত সব জায়গাতেই হামলার ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি ও লেবানিজ কূটনীতিকদের মধ্যে দুই দিনের আলোচনার পর বুধবার উভয় দেশ একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা হিজবুল্লাহর কিছু পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি এই নতুন শর্ত মেনে নেবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদি যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল না হয় এবং হিজবুল্লাহ হামলা চালিয়ে যায়, তবে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত বৈরুতে বোমাবর্ষণের জন্য ট্রাম্পকে রাজি করাতে সক্ষম হতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বুধবার বলেছেন, তিনি ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতকে ইরানের যুদ্ধ থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা করছেন এবং তিনি মনে করেন যে এই সপ্তাহের শেষ নাগাদ ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, নেতানিয়াহু লেবাননে সংযম দেখানো এবং ইরানের সঙ্গে চুক্তি, উভয় বিষয়কেই সন্দেহের চোখে দেখেন এবং দুটি বিষয়ই তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। মার্কিন কর্মকর্তারাও চিন্তিত যে নেতানিয়াহু হয়তো উভয় ফ্রন্টেই তাদের কূটনীতিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে নির্বাচনের মাত্র চার মাস আগে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়ানোর মতো ঝুঁকি নেওয়ার কোনও সুযোগ এই মুহূর্তে নেতানিয়াহুর হাতে নেই।
সূত্র: অ্যাক্সিওস