যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমূজ প্রণালি সব ধরনের তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। একই সঙ্গে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতের চেষ্টা করলে যেকোনো জাহাজে সরাসরি গুলি চালানো হবে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং সংবেদনশীল নৌপথ। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত সাগরে পৌঁছানোর একমাত্র পথ এটি। সাধারণ সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
অবশ্য গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফা হামলার পরপরই ইরান এই নৌপথটি সাধারণ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় এই জলপথটিই তেহরানের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার। এরপর থেকে গত কয়েক মাসে ইরান মাঝেমধ্যে কিছু জাহাজকে শর্তসাপেক্ষে পারস্য উপসাগর পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আদায়েরও অভিযোগ উঠেছে।
তাহলে চলমান সংকটের মাঝে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ভোরে ইরান কেন নতুন করে আবারও এই প্রণালি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলো?
কেন এই নতুন ঘোষণা?
চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের টানা কয়েক দিনের বিমান হামলার প্রতিক্রিয়াতেই দেশটির সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার ভোরে এই নির্দেশ জারি করে। তবে মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এখনও কিছু জাহাজ এই পথ দিয়ে পার হতে পারছে।
মঙ্গলবার ইরানি গণমাধ্যমজানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস এবং কাছের কেশম দ্বীপে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সিরিক অঞ্চলে মার্কিন হামলায় ২০ হাজার মানুষের পানি সরবরাহের একমাত্র জলাধারটি ধ্বংস হয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই হামলাকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, সোমবার হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা এবং আঞ্চলিক জলসীমায় মার্কিন সেনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে সাম্প্রতিক হামলার জবাবে এই ‘আনুপাতিক ও নিয়মতান্ত্রিক’ পাল্টা আঘাত হানা হয়েছে। তবে ইরান ওই হেলিকপ্টারে ইচ্ছাকৃত হামলার কথা অস্বীকার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ঘটনাটি তদন্ত করছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আশা করা হলেও তা দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের মার্কিন হামলার জবাবে বাহরাইনে মোতায়েন মার্কিন পঞ্চম নৌবহরে ড্রোন হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে তাদের অ্যারোস্পেস ফোর্স জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে দূরপাল্লার সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনীও ‘শত্রুভাবাপন্ন আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। ওই সময় বাহরাইনেও বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়। আইআরজিসি সতর্ক করেছে যে, মার্কিন ‘আগ্রাসন’ অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিশ্চিত করেন যে, ওয়াশিংটন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই ইরানের ‘প্রধান প্রধান স্থাপনা’ লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালাচ্ছে। ফ্লোরিডার টাম্পায় সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দফতরের বাইরে হেগসেথ বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘কঠোর’ আঘাত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং প্রয়োজন হলে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো এই হামলা চলবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একটি দুর্দান্ত চুক্তি সইয়ের আলোচনার জন্য তারা অনেক বেশি সময় নষ্ট করেছে; এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তার পরপরই বুধবার দুই পক্ষ আবারও সংঘাতপূর্ণ অবস্থানে জড়ায়। মার্কিন বাহিনী ইরানে নতুন দফায় বিমান হামলা চালায়, অন্যদিকে তেহরানও কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন স্থাপনা ও সরঞ্জামের ওপর পাল্টা আঘাত হানে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবারের এই মার্কিন হামলাকে ‘বেআইনি ও অপরাধমূলক’ বলে নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এর মাধ্যমে চলমান যুদ্ধবিরতি ‘অর্থহীন’ হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধবিরতি কি তবে ভেস্তে যাচ্ছে?
গত ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যকার সরাসরি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের কাছে শান্তি চুক্তির নানাবিধ প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব পাঠিয়ে আসছিল। তবে বেশ কিছু বিষয়ে এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে; বিশেষ করে ইসরায়েল কর্তৃক লেবানন দখল এবং সেখানে অনবরত হামলা চালানো। ইরান যেকোনো শান্তি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, যা ইসরায়েল সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলা মূলত ইসলামাবাদ বৈঠকের আগে গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত একটি ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরের ধৈর্য পরীক্ষা করার শামিল।
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিজা মানিয়ার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ‘টিট ফর ট্যাট’ স্টাইলের হামলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এতে চরম উত্তেজনাপূর্ণ এই পরিবেশে যেকোনো মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। লেবাননকে চূড়ান্ত চুক্তির বাইরে রেখে এই মুহূর্তে সংকটের কোনও ‘স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমাধান’ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, উভয় পক্ষই ভাবছে তারা এই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু বারবার হামলার ঘটনা সংযমকে নষ্ট করে। যদি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়, তবে এই নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।’
সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো সমীর পুরী বলেন, বুধবার রাতের হামলা ইঙ্গিত দেয় যে পরিস্থিতি ‘সহজে শান্ত হওয়ার নয়’। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে বড় সংঘাত। ফলে এটি আরও বড় রূপ নেওয়ার সব ধরনের আশঙ্কা রয়েছে, তবে আশার কথা হলো দুই পক্ষই এখনও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
হরমু প্রণালিতে আসলে কী ঘটছে?
গত ২ মার্চ আইআরজিসি-এর প্রধান কমান্ডারের সিনিয়র উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারী ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রণালিটি ‘বন্ধ’ এবং কোনও জাহাজ তা অতিক্রম করার চেষ্টা করলে আইআরজিসি ও নৌবাহিনী তাতে ‘আগুন ধরিয়ে দেবে’। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহকারী এই রুটটি বন্ধের ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬৫ ডলার থেকে এক লাফে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
এরপর ৮ এপ্রিল দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলে ইরান প্রণালিটি খুলে দিতে রাজি হয়। ওয়াশিংটন ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি করিয়ে দেওয়ার পর ১৭ এপ্রিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য এটি খোলা হয়েছিল। কিন্তু ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৩ এপ্রিল ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিসহ ইরানের সব বন্দরে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। এর জবাবে ১৮ এপ্রিল ইরান আবারও জলপথটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং ইরানি বন্দরগামী জাহাজ জব্দ করার ঘটনাকে আইআরজিসি ‘জলদস্যুতা ও সামুদ্রিক চুরি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তারা জানায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না ইরানগামী এবং ইরান থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর অবাধ যাতায়াতের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিচ্ছে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালির ওপর সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাবস্থা বজায় থাকবে।’ এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘর্ষের পর বুধবার ইরান আবারও এই রুট বন্ধের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করে।
কার লক্ষ্য কী?
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুয়াদ ইজাদি বলেন, তেহরান মূলত নিশ্চিত করতে চায় যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যেন একমাত্র ইরানের হাতেই থাকে। তিনি বলেন, ‘এর জন্য ইরান যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত, কারণ এটিই তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা দেয়।’
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত হরমুজ প্রণালিতে নজরদারি করার ইরানি সক্ষমতা ধ্বংস করতে চাইছে। সমীর পুরী বলেন, ‘সম্প্রতি যেভাবে বন্দর আব্বাস ও কেশম দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং আইআরজিসি-র পক্ষ থেকেও রাডার স্টেশনগুলোতে হামলার কথা বলা হয়েছে, তা দেখে মনে হয় মার্কিন সামরিক বাহিনী হয়তো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নজরদারি এবং জাহাজ-বিধ্বংসী হামলা চালানোর ক্ষমতাকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর।’
তবে ফুয়াদ ইজাদি মনে করেন, মার্কিন বাহিনীর এই কৌশল সফল নাও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি মোকাবিলার জন্য এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করতে পারস্য উপসাগরের ঠিক পাশেই ইরানের সামরিক স্থাপনা থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। ইরান একটি বিশাল দেশ এবং তাদের কাছে দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রয়েছে।’
ইজাদির মতে, এই সংকটের একমাত্র সমাধান রাজনৈতিক আলোচনা, সামরিক শক্তি দিয়ে ওয়াশিংটন তাদের নীতিগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না।
এর মধ্যেও কি কোনও জাহাজ পার হতে পেরেছে?
হ্যাঁ, পেরেছে। সংঘাত চলাকালীন ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন ‘অ-শত্রুভাবাপন্ন’ দেশের জাহাজগুলোকে তারা পার হতে দেবে। গত ২৬ মার্চ আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের ১৭৬টি সদস্য দেশকে পাঠানো এক চিঠিতে ইরান স্পষ্ট করে জানায়, যারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনও আগ্রাসনে অংশ নেবে না বা সমর্থন করবে না এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে চলবে, তারা ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ পারাপারের সুবিধা পাবে।
এরপর ইরানের দৃষ্টিতে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ কিছু দেশের সঙ্গে আলাদা আলোচনার পর মার্চ মাসে অবরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের কিছু জাহাজকে এই প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়।
শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্ট-এর মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পথ পার হওয়া অন্তত দুটি জাহাজ ইরানকে চীনা মুদ্রা ইউয়ান-এ টোল পরিশোধ করেছে। একটি চীনা সামুদ্রিক পরিষেবা সংস্থা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এই পারাপার ও অর্থপ্রদানের বিষয়টি দেখভাল করেছে। তবে জাহাজগুলো ঠিক কত টাকা পরিশোধ করেছে তা জানা যায়নি।
শিপ-ট্র্যাকিং ডাটা কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে ২৭৯টি জাহাজ এই প্রণালি পার হয়েছে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, গত পাঁচ সপ্তাহে ৮০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া লয়েডস লিস্টের তথ্য মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি জাহাজ তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বন্ধ করে এই পথ পাড়ি দিয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই নগণ্য। যুদ্ধ শুরুর আগে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি জাহাজ চলাচল করত।
পারাপার হওয়া জাহাজে কি হামলা হয়েছে?
হ্যাঁ, কিছু জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হলেও এই ঝুঁকি এড়ানো যায়নি। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ২২টি জাহাজে হামলা হয়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল ইরান এই রুট সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর, আগে অনুমতি পাওয়া দুটি ভারতীয় জাহাজে হরমুজ প্রণালির ভেতরে হামলা চালানো হয়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, একই দিনে ওমানের উত্তর-পূর্বে আইআরজিসির গানবোট থেকে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে গুলি চালানো হয়, তবে জাহাজ ও ক্রু সুরক্ষিত ছিলেন। এই ঘটনার পর ভারত নয়া দিল্লিতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এর তীব্র প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা দাবি করে। এর আগে ২২ এপ্রিল আইআরজিসি অনুমতি ছাড়া প্রবেশের অভিযোগে দুটি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করে নিজেদের উপকূলে নিয়ে যায়।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে গত বুধবার মেহর নিউজ এজেন্সি জানায়, অবৈধভাবে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টার সময় আইআরজিসি নৌবাহিনী আরও দুটি জাহাজে আঘাত করেছে। একই দিনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরান থেকে তেল পরিবহনের অভিযোগে তারা ‘পালাউ’-এর পতাকাবাহী এম/টি সেত্তেবেলো নামক একটি ট্যাংকারকে অকেজো করে দিয়েছে। মার্কিন বিমান থেকে জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হলে সেখানে থাকা তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন।
ওমান উপকূলে এই বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে নয়া দিল্লি একজন শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে তলব করেছে বলে। বৃহস্পতিবারও সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল পরিবহনের চেষ্টার সময় তারা আরেকটি তেল ট্যাংকার অকেজো করে দিয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ৮টি জাহাজ অকেজো করেছে, ১৩৪টির রুট পরিবর্তন করেছে এবং মানবিক সহায়তা সামগ্রী বহনকারী ৪২টি জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী?
হরমুজ প্রণালির এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে, যার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অবরোধ শুরুর পর তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী ব্যারেল প্রতি ৬৫ ডলার থেকে এক লাফে ১২৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল।
বৃহস্পতিবার মার্কিন-ইরান সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বাড়লেও পরে তা কিছুটা স্থিতিশীল হয়। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৩ দশমিক ১৮ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট-এর পরিচালক আলী বায়েজ বলেন, ইরানের এই সর্বশেষ ঘোষণা বাজারকে আরও বেশি অস্থির করে তুলবে। তেলের দাম বাড়লে তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলা বন্ধ করার জন্য এক ধরনের বড় আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করবে।
হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে কেবল তেল নয়, বিশ্বজুড়ে সার এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন বলেন, ইরানের এই ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে তারা তাদের অবস্থানে অনড়। পারস্য উপসাগরে মার্কিন সরঞ্জামে ইরানের এই ক্রমাগত আঘাত প্রমাণ করে যে দুই পক্ষ একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান থেকে কতটা দূরে রয়েছে এবং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর এই যুদ্ধ থামানোর একটি কার্যকর পরিকল্পনা দেখানোর জন্য তীব্র চাপ তৈরি করছে, যা দেখাতে তারা এ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা