ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বিশ্বকাপ দেখছেন গাজার মানুষ

দুই বছরেরও বেশি সময় আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে গাজা স্ট্রিপ প্রিমিয়ার লিগ। সেই থেকে আর মাঠে নামতে পারেননি ফাদি আল-আরাউই। অধিকাংশ গাজাবাসীর মতো এখন তার এমন একটি বাড়িও নেই, যেখানে বসে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ ফুটবল উপভোগ করবেন।

গত শনিবার কাতার বনাম সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার ম্যাচটি যখন শুরু হতে যাচ্ছিল, তখন আরাউই তার পুরনো গাজা স্পোর্টস ক্লাবের পেশাদার জার্সি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জেতা পদকগুলো পরেছিলেন। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়া একটি স্কুলের কক্ষে বন্ধুদের সাথে বসে ম্যাচটি দেখার জন্য অন্ধকারের মধ্যে একটি জ্বলজ্বলে ল্যাপটপের ওপর ঝুঁকে ইন্টারনেট সিগন্যাল খোঁজার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

খান ইউনিসে মাথার ওপর ইসরায়েলি ড্রোনের গুনগুন শব্দের মাঝেই ৩৮ বছর বয়সী আল-আরাউই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, দেখুন, এই যে ইন্টারনেট, ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই এটি কাটতে শুরু করেছে। ড্রোনের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন? আমরা বাঁচতেও পারি, মরতেও পারি, যেকোনও সময় আমাদের ওপর বোমা পড়তে পারে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার পর গাজায় দুই বছরব্যাপী সামরিক আগ্রাসন চালায় ইসরায়েল। এতে গাজার বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এবং এর অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, এবং হামাস এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ল্যাপটপে স্ট্রিম করা ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ অন্যদের সঙ্গে বসে দেখছেন সাবেক ফিলিস্তিনি ফুটবলার ফাদি আল-আরাউই। ছবি: সংগৃহীত

‘সবকিছুর পরও আমরা ম্যাচ দেখবো’

উপকূলবর্তী হামাস-নিয়ন্ত্রিত এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার প্রায় সকলেই প্রধানত তাঁবু এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন।

গাজা সিটির রয়্যাল ক্যাফে পরিচালনাকারী আলা বাবলি মধ্যরাতের পর জ্বালানি চালিত জেনারেটর বন্ধ হয়ে গেলেও গভীর রাতের ম্যাচগুলো যাতে স্ক্রিনে দেখানো যায়, সেজন্য দুটি বিকল্প বিদ্যুৎ লাইন এবং একটি ব্যাকআপ ব্যাটারি স্থাপন করেছেন।

ক্যাফের দেওয়ালে ঝোলানো মিশর ও মরক্কোর পতাকার নিচে ম্যাচ দেখতে আসা হানি আবু রিজক বলেন, গাজাবাসীরা বাইরে বের হলে কখনই ভয় থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। তিনি বলেন, এই ক্যাফেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। আমার পাশের কোনও কিছু লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এবং আমি আমার জীবন হারাতে পারি। কিন্তু আমরা যে কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সবকিছুর পরও আমরা আমাদের জীবন চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা ম্যাচ দেখবো।

ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে যুদ্ধে ইসরায়েলের হাতে নিহত ৭৩,০০০ ফিলিস্তিনির মধ্যে ১,০০০ জন ক্রীড়াবিদ রয়েছেন; যাদের মধ্যে শিশু ও অপেশাদার খেলোয়াড় থেকে শুরু করে রেফারি এবং পেশাদার ক্রীড়াবিদও আছেন।

ইসরায়েল প্রায় ২৮৫টি ক্রীড়া সুবিধাও ধ্বংস করেছে যার কিছু বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু বোমায় ধুলিসাৎ হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী স্টেডিয়ামগুলোকে ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক শিবিরে পরিণত করেছে, যার কয়েকটি বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগের কারণে কুখ্যাত হয়ে উঠেছে, যদিও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে।

গাজা সিটির একটি ক্যাফেতে ফিলিস্তিনি ফুটবল ভক্তরা ২০২৬ বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছেন। ছবি: সংগৃহীত

গাজা সিটির অঞ্চলের প্রধান আল-ইয়ারমুক স্টেডিয়াম যেখানে আল-আরাউই এবং অন্যান্য পেশাদাররা একসময় হাজার হাজার দর্শকের সামনে খেলতেন তা এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য একটি তাঁবু নগরীতে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মুস্তফা সিয়াম বলেন, ২০২৩ সালে ইসরায়েলি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফিলিস্তিনি ক্রীড়াঙ্গন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: রয়টার্স