যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। খামেনির মৃত্যুর কয়েক মাস পর আয়োজিত এই শেষকৃত্যের সময় তার মরদেহ ইরান এবং প্রতিবেশী ইরাকের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হবে।
প্রায় চার দশক ধরে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়া খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হন। তবে যুদ্ধ চলার কারণে এতদিন তার শেষ বিদায় স্থগিত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই জানাজা ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চলা বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী দমনপীড়নের ঠিক ছয় মাস পর এই আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে এর মাধ্যমে খামেনির পক্ষে কতটা জনসমর্থন রয়েছে, তা যাচাইয়ের চেষ্টা করবে দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব। এই লক্ষ্যে সাধারণ জনগণ, সরকারি কর্মচারী এবং আধাসামরিক বাহিনীকে রাস্তায় নামাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি চলায় কর্তৃপক্ষ এখন এই অনুষ্ঠান আয়োজন ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে আনার সাহস পাচ্ছে। কারণ যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ইরানের একাধিক শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছে, যার অন্তত একটির ক্ষেত্রে জনসমক্ষে আসার সূত্র ধরে তাদের ট্র্যাক করা হয়েছিল। তবে খামেনির ছেলে এবং ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাবার ওপর হওয়া ওই হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয় এবং বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন।
দিনব্যাপী শেষকৃত্যের কর্মসূচি
শনিবার ইরানের রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ প্রদর্শনের মাধ্যমে এই আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যা রবিবারও চলবে। সোমবার তেহরানের রাস্তায় শোকমিছিল শেষে মরদেহটি ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শিয়াদের পবিত্র নগরী কোমে নিয়ে যাওয়া হবে এবং মঙ্গলবার সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।
বুধবার খামেনির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ইরাকের কারবালায়, যেখানে শিয়া মুসলমানদের প্রতিরোধের প্রতীক হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের মাজার রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে, এই বুধবারেই খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভের বর্ষপূর্তি, যে আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন।
দাফন হবে মাশহাদের পবিত্র মাজারে
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরাক থেকে ফিরিয়ে আনার পর ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা মাজারে খামেনিকে দাফন করা হবে। ইমাম রেজা ছিলেন শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম। প্রতি বছর লাখ লাখ পুণ্যার্থী এই মাজার জিয়ারত করেন। ইরানি শিয়াদের মতে, যেকোনো দুঃখী বা পাপী ব্যক্তি এখানে এলে মুক্তি পান। এর আগে ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিসহ অনেক প্রখ্যাত শিয়া ধর্মগুরুকে এই মাজারে দাফন করা হয়েছে।
হুড়োহুড়ি ও প্রাণহানির আশঙ্কা
লাখ লাখ মানুষের সমাগম হলে অতীতে ইরানে একাধিকবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালের ৬ জুন ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির শেষকৃত্যে লাখ লাখ ইরানি রাস্তায় নেমে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শোকাকুল জনতা কফিনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে খোমেনির সাদা কাপড়ে মোড়ানো মরদেহটি ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায়। ওই বিশৃঙ্খলায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং প্রায় ১১ হাজার মানুষ আহত হন। একইভাবে ২০২০ সালে রেভল্যুশনারি গার্ডসের জেনারেল কাসেম সোলাইমানির দাফন অনুষ্ঠানে হুড়োহুড়িতে অন্তত ৫৬ জন নিহত এবং ২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন। খামেনির শেষকৃত্যেও এমন দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চুক্তি নিয়ে টানাপোড়েনের মাঝেই শেষকৃত্য
গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মাধ্যমে ইরান যুদ্ধের অবসান, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই চুক্তির অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে কাতারে কারিগরি আলোচনা শুরু হলেও তা গভীর মতভেদ এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে মারাত্মকভাবে জটিল হয়ে পড়েছে।
সূত্র: এপি