যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহের লড়াই শেষে গত কয়েক দিন ধরে ইরানের আকাশ বোমাবর্ষণ ও বিমান হামলার শব্দ থেকে মুক্ত রয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা কোনও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হননি, এবং মার্কিনদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতেও তাদের কোনও তাড়াহুড়ো নেই। বরং নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা তুলে ধরছেন তেহরানের কর্মকর্তারা। সামরিক নেতারা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের বড়াই করছেন এবং তারা আলোচনার জন্য ব্যাকুল, মার্কিনদের এমন দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছেন কূটনীতিকরা।
তেহরানের এই অনমনীয় মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের বর্তমান এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি নিয়ে তারা বেশ স্বস্তিতে রয়েছে। ইরানি নেতাদের বিশ্বাস, তারা পুনরায় শুরু হওয়া লড়াই সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ইরানের প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি আদায় করা, যা যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে নারাজ।
তবে যে কোনও মুহূর্তে যুদ্ধ বা শান্তি আসার এই অনিশ্চয়তা ইরানের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যে কোনও সময় ফের লড়াই শুরু হতে পারে, স্থায়ী সমাধান এখনো বহুদূর এবং অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি ও মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি আরও বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক মুখপাত্র রমজান শরিফ বলেন, ইরানের শত্রু প্রতিটি পদক্ষেপে কৌশলগত পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
সংঘাত থামার বিষয়ে ইরানি কূটনীতিকরা কিছুটা সংযত প্রতিক্রিয়া দেখালেও আপসের কোনও ইঙ্গিত দেননি। লড়াই বন্ধের কয়েক দিন পর সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, বর্তমানে যা ঘটছে তাকে কোনোভাবেই ‘যুদ্ধবিরতি’ বলা যায় না।
এর আগে সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে আলোচনার জন্য ইরানই লড়াই স্থগিতের অনুরোধ করেছে এবং দুই পক্ষ আলোচনায় যুক্ত আছে।
বাঘাই ট্রাম্পের সেই দাবি অস্বীকার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বর্তমানে কোনও আলোচনা চলছে না। তবে অস্ট্রিয়ার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া মন্তব্যে তিনি স্বীকার করেন যে পাকিস্তান ও কাতার দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধকে ‘তাদের নিজেদের তৈরি এক পঙ্কিল জলাভূমি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি জানান, ইরানের মূল আলোচনা চলছে ওমানের সঙ্গে ক্রুড অয়েল ও গ্যাস পরিবহনের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে, যা ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণের পর ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল।
রাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপ-এর জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ইরানিরা বিশ্বাস করে সময় তাদের পক্ষে। তারা মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে কষ্ট ও চাপ সহ্য করার ক্ষমতা তাদের বেশি এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তাদের দাবি মেনেই চুক্তিতে পৌঁছাবেন, যার জন্য ইরানকে কোনও ছাড় দিতে হবে না।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোক্তাদের জ্বালানি খরচ বেড়েছে। তবে উভয় পক্ষ আক্রমণ স্থগিত করায় গত কয়েক দিনে তেলের দাম বেশ কমেছে।
তবে গ্রেগরি ব্রিউ সতর্ক করে বলেন, ইরান সীমার অতিরিক্ত আশা করে ফেলছে। ট্রাম্পের জন্য হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে যুদ্ধ আরও বাড়ানো অনেক বেশি আকর্ষণীয় পথ হতে পারে এবং অন্য দেশগুলোও জাহাজের ওপর ইরানের শুল্ক মেনে নেবে না। ইরান যদি এই প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও সমঝোতামূলক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবেই পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অন্যথায় ট্রাম্প আবার বিমান হামলায় ফিরে যাবেন, যেটিকে তিনি কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার মনে করেন। তিনি ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে চেষ্টা করবেন, যা ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি এবং অবশিষ্ট সামরিক সক্ষমতার ওপর আরও বড় আঘাত হানবে।
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস