দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে আসছিলেন যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেন হারতে বসেছে। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতি ও ট্রাম্পের মনোভাব দুই জায়গাতেই এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি মোহভঙ্গ এবং বিপরীতে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দৃঢ়তায় মুগ্ধ হয়ে এখন ইউক্রেনকে নিয়ে নতুন আশাবাদ ব্যক্ত করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মতে, ট্রাম্প মূলত ‘বিজয়ীদের’ পছন্দ করেন এবং তার সাম্প্রতিক মূল্যায়নে জেলেনস্কিকে দিন দিন একজন বিজয়ী বলেই মনে হচ্ছে। গত বছর ট্রাম্প জেলেনস্কিকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে সমালোচনা করেছিলেন এবং ওভাল অফিসের এক উত্তপ্ত বৈঠকের পর ইউক্রেনে সব ধরনের সামরিক সহায়তা স্থগিত করেছিলেন। তবে সম্পর্কের এই বরফ গলতে শুরু করে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যস্থতা, পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্যে সংক্ষিপ্ত বৈঠক এবং সাম্প্রতিক কিছু অভাবনীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে।
যুদ্ধের গতিপথ ও ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বড় ভূমিকা রেখেছে ইউক্রেনের অবিশ্বাস্য ড্রোন প্রযুক্তি ও এক বক্সারের কূটনীতি। ইউক্রেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে বছরে তারা মাত্র ৫ হাজার ড্রোন তৈরি করত, ২০২৬ সালে তা বেড়ে লাখ লাখ ড্রোনে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সাইবেরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা এবং কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-রাশিয়া অস্ত্র সরবরাহ লাইনে আঘাত হানার ঘটনায় অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী যে ধরনের ইরানি ‘শাহেদ’ ড্রোনের মুখোমুখি হচ্ছে, ইউক্রেন যেভাবে তা প্রতিহত করছে, তাতে কিয়েভের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের আস্থা বেড়েছে। ট্রাম্প এখন ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়া এবং যৌথ ড্রোন উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
পাশাপাশি ট্রাম্পের মন গলাতে কাজ করেছে বক্সিং কূটনীতি। ওভাল অফিসের এক বৈঠকে ইউক্রেনের হেভিওয়েট বক্সার ওলেকসান্দার উসিক ইউক্রেনীয়দের ‘যোদ্ধা ও বিজয়ী’ হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্পকে একটি স্বাক্ষরিত বক্সিং গ্লাভস উপহার দেন। প্রয়াত বিখ্যাত বক্সার মুহাম্মদ আলীর প্রতি দুজনের অনুরাগের কারণে তাদের মধ্যে দ্রুতই হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ট্রাম্প যখন জানতে চান যে একজন রুশ ও ইউক্রেনীয়র মধ্যে পার্থক্য কোথায়, তখন উসিক নিজের মাথা ও হৃদয়ের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, পার্থক্যটা এখানেই।
তাছাড়া ইউক্রেনের কট্টর সমালোচক ও ডানপন্থি কর্মী লরা লুমার কিয়েভ সফর করে জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ট্রাম্পকে ফোন করে জেলেনস্কিকে একজন ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ও ইউরোপীয় নেতাদের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও ট্রাম্পের অবস্থান বদলাতে সাহায্য করেছে।
অক্টোবরের পর মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন জেলেনস্কি। তবে ট্রাম্পের এই নতুন শ্রদ্ধা কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়; কারণ অতীতে পুতিনও ট্রাম্পকে নিজের যুক্তি বোঝাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। আপাতত উভয় পক্ষের উচ্চ প্রাণহানির কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন এবং হোয়াইট হাউস এখনও আশা করছে যে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল