মার্কিন ঘাঁটি ও তাদের মিত্রদের ওপর হামলা জোরদার করার মাধ্যমে নিজেদের যুদ্ধনীতিতে দৃঢ় ঐক্য দেখাচ্ছে ইরানের নেতৃত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, এমনটি প্রমাণেই তারা একতাবদ্ধ। তবে যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দেশটির ভেতরের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে।
একপক্ষে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনার বিরোধী চরমপন্থি ‘পায়দারি’ (ফারসি শব্দ, যার অর্থ স্থায়িত্ব) আন্দোলনের নেতারা। তারা যুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ জয় চান এবং সমাজব্যবস্থায় ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চান। অন্যপক্ষে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সমর্থকরা। তারা সামরিক চাপকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতির ওপর পড়া চরম চাপ ও সামাজিক পরিবর্তনের চাহিদাই এই মধ্যপন্থি পক্ষটিকে কিছুটা নমনীয় অবস্থানের দিকে চালিত করছে।
গালিবাফের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, আলোচনা হলো একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার এবং সামরিক পদক্ষেপের পরিপূরক, যা শত্রুকে বাধ্য করে বাস্তব সুবিধা বা ছাড় আদায় করে নেয়।
শীর্ষ ক্ষমতার ভেতরে এমন প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুদ্ধপরবর্তী ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ লড়াইকে ইঙ্গিত করছে। এতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অবস্থান নিয়ে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধে বাবা নিহত হওয়ার সময় আহত হওয়া মোজতবা খামেনি আত্মগোপনে থাকলেও উভয় পক্ষই তার সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করছে।
অবশ্য এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের ১৩ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনই সায় দিয়েছিলেন। একমাত্র বিরোধী ভোটটি দিয়েছিলেন পায়দারি আন্দোলনের শীর্ষ নেতা সাঈদ জলিলি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা ও অবরুদ্ধ অর্থ ছাড় না হওয়ায় চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। ফলে এখন জবাব দেওয়ার বিষয়ে নেতৃত্বে বড় কোনও বিভাজন নেই বলে জানান গবেষক আলী ওয়ায়েজ।
এদিকে চরমপন্থিরা জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম (আইআরআইবি) নিয়ন্ত্রণ করে মধ্যস্থতার বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা স্পিকার গালিবাফ ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচারের মাঝেই কেটে বাদ দেয়। এর জবাবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাধ্যমটি এমনভাবে উপস্থাপন করছে যেন ‘সামরিক বাহিনী একদিকে আর সরকার অন্যদিকে’। পাশাপাশি সংস্কারবাদী শক্তিতে লাগাম টানতে সম্প্রতি হিজাব আইন অমান্যের অজুহাতে তেহরানের বেশ কিছু ক্যাফে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপন্থিরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মুদ্রা দরপতনে জর্জরিত জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়বে। জুলাই মাসে আড়াই শতাধিক বুদ্ধিজীবী ও সাবেক এমপি এক যুদ্ধবিরোধী স্মারকে স্বাক্ষর করে শান্তির তাগিদ দিয়েছেন। পেজেশকিয়ান সতর্ক করে বলেছেন, দশকের পর দশক চলা সংঘাত ও নিষেধাজ্ঞায় ইরান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সূত্র: এপি