সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ইসরায়েলকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন, এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। জবাবে নেতানিয়াহু এরদোয়ানকে ‘ইহুদি-বিরোধী স্বৈরাচার’ বলেছেন এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তুরস্ককে ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাজনৈতিক এই তিক্ততা কেবল কথার যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়া, গাজা, হর্ন অব আফ্রিকা এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের শেষের দিকে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে পূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিচ্ছে আঙ্কারা। অন্যদিকে, ইসরায়েল নিরাপত্তা শঙ্কায় সিরিয়ার সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
সম্প্রতি উত্তর সিরিয়ায় তুরস্কের সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলায় দুই দেশের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। ইসরায়েলের দাবি ছিল, তুর্কি বাহিনীর মোতায়েন ঠেকাতে এই হামলা; যদিও তুরস্ক ও সিরিয়া এমন কোনও পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক এই ঘটনাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা’ বলে সমালোচনা করেছেন। ১৯ আগস্ট নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দেন, সিরিয়ায় তুর্কি বাহিনীর কোনও উপস্থিতি ইসরায়েল মেনে নেবে না। এর দুই দিন পর ২১ আগস্ট তুরস্ক ঘোষণা দেয়, ফিলিস্তিনপন্থি কর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে এরদোয়ান সরকার ইন্টারপোলের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানে গণহত্যার অভিযোগ তুলে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন এরদোয়ান এবং হামাসকে সমর্থন দিয়েছেন। এ ছাড়া সোমালিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এরদোয়ান একে ‘অবৈধ ও গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
পাল্টা কৌশল হিসেবে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে সামরিক-জ্বালানি চুক্তি করেছে ইসরায়েল, যা এরদোয়ান ‘ফাঁকা বুলি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, সম্প্রতি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইসরায়েলি প্রভাব মোকাবিলার কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি যুদ্ধের সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে আঙ্কারা ও জেরুজালেমের মধ্যে যোগাযোগ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সিরিয়ায় সামরিক অবস্থানের কারণে ভুল বোঝাবুঝি থেকে অনিচ্ছাকৃত বড় কোনও সংঘাত সৃষ্টি হওয়াই এখন মূল ঝুঁকি।
সূত্র: উইয়ন নিউজ