ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, একটি ‘স্বাধীন ও সভ্য’ দেশের ওপর হামলার সিদ্ধান্তের পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রকে মেনে নিতে হবে। একইসঙ্গে আগ্রাসনের মূল্য পরিশোধ করে পশ্চিম এশিয়া থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আকরামিনিয়া বলেন, এ অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, তার মূল কারণ ওয়াশিংটনের একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত সমাধান হলো বাস্তবতা মেনে নেওয়া, এর মূল্য পরিশোধ করা এবং অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া।’
ইরানি এই কমান্ডার দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়া থেকে সরে গেলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং একই সঙ্গে মার্কিন জনগণ সমৃদ্ধির আরও কাছাকাছি পৌঁছাবে।
হামলার পর পাল্টা জবাব
আকরামিনিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হামলার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তিনটি দেশের চারটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান।
শুক্রবার টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ ঘটনা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা ও প্রস্তুতির প্রমাণ।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর তীব্রতা ও অগ্নিশক্তি। শত্রু বাহিনীর ওপর যে পরিমাণ হামলা চালানো হয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত ‘ধ্বংসাত্মক’।
অভিযানের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে এর ভৌগোলিক বিস্তৃতির কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশজুড়ে এ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
আকরামিনিয়া বলেন, ‘জর্ডান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।’
মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন ও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ইরানের অভিযান অত্যন্ত কার্যকর ও ধ্বংসাত্মক ছিল এবং হামলার লক্ষ্যবস্তু মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র ও আরাশ-২ ড্রোন ব্যবহারের দাবি
সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানি সেনাবাহিনী কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আকরামিনিয়া বলেন, অভিযানে ‘অত্যন্ত কার্যকর’ ফাতাহ বা ‘কনকোয়েস্ট’ সারফেস-টু-সারফেস ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি আরাশ-২ কামিকাজি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
তার দাবি, উভয় ধরনের অস্ত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এগুলো প্রতিহত করা শত্রুপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং সহজেই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম।
ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার ফলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
আকরামিনিয়া বলেন, সাম্প্রতিক দুই দফা আগ্রাসন এবং এর আগে ৪০ দিন ধরে চলা যুদ্ধের শেষ দিকেও অঞ্চলটির বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
তিনি জানান, এসব ঘাঁটির রাডার স্থাপনা ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলায় ধ্বংস করা হয়েছে। এর ফলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের জন্য অধিকৃত ভূখণ্ডে পৌঁছানোর পথ আরও সহজ হয়েছে।
তার ভাষায়, এর অর্থ হলো এখন অধিকৃত ভূখণ্ড এবং সেখানে থাকা ইসরায়েলি ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা আগের চেয়ে অনেক সহজ।
‘কৌশলগত হতাশায়’ যুক্তরাষ্ট্র
আকরামিনিয়া আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ‘কৌশলগত হতাশায়’ ভুগছে। ইরানের জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানানোই এর অন্যতম প্রমাণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানাচ্ছে, তখন ইরানের জনগণ এমনিতেই রাস্তায় রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাতে ইরানের বিভিন্ন স্থানে মানুষের সমাবেশের দিকেই তিনি ইঙ্গিত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবারও নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের পথে ওয়াশিংটন
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র বলেন, ৪০ দিনের যুদ্ধ এবং দুই দফা আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্র আবার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কৌশলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।
তার দাবি, গত ২৫ থেকে ৩০ বছরেও নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জনগণকে নতিস্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। ৪০ দিনের যুদ্ধের পরও ওয়াশিংটন আবার নিষেধাজ্ঞার পথ বেছে নিয়েছে।
আকরামিনিয়ার মতে, এ ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত হতাশার’ বড় প্রমাণ।