চলতি মাসের শেষের দিকে ইরানে বসে ‘টোফেল’ ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল ৩২ বছর বয়সী নিকির। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এই যোগ্যতা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় বিদেশে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পথ খুঁজতে হচ্ছে তাকে, যেখানে পরীক্ষা ফি এবং যাতায়াত খরচের বিপুল বোঝা যুক্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের’ যে নীতি গ্রহণ করেছে, তার অংশ হিসেবে গত আগস্টে ঘোষিত সর্বশেষ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর দেশটিতে এই পরীক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে।
উত্তর গোলিস্তান প্রদেশের লাহিজন শহরের একটি পেস্ট্রি শপে কর্মরত নিকি জানান, পরীক্ষা বাতিলের খবর শুনে তিনি কয়েকদিন রুম থেকেই বের হননি এবং কান্নাকাটি করেছেন। তার সব পরিকল্পনা মাঝপথে আটকে গেছে।
টোফেল পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা মার্কিনভিত্তিক ‘এডুকেশনাল টেস্টিং সার্ভিস’ (ইটিএস) তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, মার্কিন অর্থ বিভাগ লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ইরানে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে ইরানিরা বিদেশে গিয়ে এই পরীক্ষা দিতে পারবেন।
দেশটির সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পিটিই এবং দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকা ডুওলিঙ্গো অনলাইন পরীক্ষাসহ অন্যান্য বিকল্প মাধ্যমগুলোর কার্যক্রমও ইরানে বন্ধ রয়েছে। নিকি আফসোসের সঙ্গে বলেন, আমরা এখন আর এখানে কোনও পরীক্ষা দিতে পারছি না।
তবে বিদেশে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া সাধারণ ইরানিদের ক্ষমতার বাইরে। কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা দেশটির অর্থনীতি সাম্প্রতিক ছয় মাসের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানি রিয়ালের মান সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে সম্প্রতি প্রতি ডলারের বিপরীতে ২২ লাখ রিয়ালে ঠেকেছে। গত ২২ আগস্ট শেষ হওয়া ইরানি মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৮৯ শতাংশে পৌঁছানোয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
নিকি জানান, তিনি প্রতিবেশী আর্মেনিয়া গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ঋণের চেষ্টা করছেন। দাঁতের চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা এখন পরীক্ষা আর ভ্রমণের পেছনে খরচ করতে হচ্ছে তাকে।
টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপে সাড়ে ২৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী কম খরচে দ্রুত পরীক্ষা দেওয়ার উপায় খুঁজছেন। তবে আকাশপথে খরচের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই ইস্তাম্বুল বা অন্যান্য জায়গায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এক শিক্ষার্থী টেলিগ্রামে লিখেছেন, ইস্তাম্বুলে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া কেবল ধনীদের কাজ, যারা বিমানের ভাড়া বহন করতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। দেশটির বিজ্ঞানমন্ত্রী হোসেইন সিমাই সারাফ এই পদক্ষেপকে ‘প্রস্তর যুগের আচরণ’ বলে অভিহিত করেন।
তেহরানের ৩২ বছর বয়সী বাসিন্দা লায়লা চলতি গ্রীষ্মে বার্লিনে চারুকলায় স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার কারণে তিনি ইতোমধ্যে এক বছর পড়ালেখা পিছিয়েছেন। তার ওপর পরীক্ষা স্থগিতের খবর তাকে গভীর হতাশায় ফেলেছে। তিনি জানান, অর্থনৈতিক কারণে দেশের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে দেশেই পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
সূত্র: এএফপি