গত তিন বছরে ৭ অক্টোবরের হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর পুরো অঞ্চল সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ভাঙনে চিহ্নিত হয়েছে। ইরানের আঞ্চলিক ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মিত্রদের নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম।
ইসরায়েল কিছু সাফল্য পেয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের অনেক নেতা নিহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ইসরায়েল গাজার বেশির ভাগ অংশ দখল করে রেখেছে, যেখানে তারা ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং এর বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
তবে এই সামরিক আগ্রাসনের মূল্যও দিতে হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে অজনপ্রিয় হয়েছে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে আরও স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির সম্ভাবনা অন্তত স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।
উল্টো ইসরায়েল অঞ্চলজুড়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে কাতারের দোহায় হামলার মতো আগে মেনে চলা রেড লাইন তারা অতিক্রম করেছে। ফলে বিশ্বের অনেক সরকার ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রধান উৎস হিসেবে দেখছে।
নিরাপত্তা নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমার পাশাপাশি জোট ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাটকীয় পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। ইরানের নেটওয়ার্কের বড় অংশ, বিশেষ করে হিজবুল্লাহ, ইসরায়েলি চাপের মুখে ভেঙে পড়েছে বলে মনে হয়েছে। ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে হিজবুল্লাহর সুনাম দীর্ঘদিন কাজ করেছে।
এতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও উৎসাহ পেয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এবং ২০২৬ সালের মার্চে ইসরায়েলি সেনারা লেবানন আক্রমণ করে। ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর স্বল্পস্থায়ী ক্ষমতার শূন্যতার সময় তারা সিরিয়ার ভূখণ্ডও দখল করে।
চ্যাটাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সব সময়ই বহুপক্ষীয় জোটে বাঁধা ছিল। তবে এখন তা আরও বেশি। তিনি সিরিয়ায় তুরস্ক এবং ইরান যুদ্ধ শেষ করার আলোচনায় চীনের সম্পৃক্ততার মতো বাইরের শক্তিগুলোর বাড়তি প্রভাবের কথা বলছিলেন। বেইজিং নিজের জ্বালানি সরবরাহ হুমকির মুখে দেখছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এইচএ হেলিয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি, অর্থাৎ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কথা উল্লেখ করে বলেন, ৭ অক্টোবরের আগে অঞ্চলটিতে ইসরায়েলের উপস্থিতি স্বাভাবিক করার ওপরই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পুরো ভিত্তি দাঁড়িয়ে ছিল। তার ভাষ্য, ৭ অক্টোবরের হামলার প্রতি ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া সেটির অবসান ঘটিয়েছে।
ইসরায়েলকে কেন্দ্রে রেখে স্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যের বদলে এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। এরপর তেহরান উপসাগরজুড়ে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করায় মার্কিন নিরাপত্তা ধারণার ভেঙে পড়েছে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে এবং দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ও ফুজাইরার তেল এলাকায় আগুন ধরিয়েছে। সেপ্টেম্বরে হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে এগিয়ে বন্দর মোখা ও আশপাশের দ্বীপ দখল করে। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে ব্যাঘাতের পর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
ফেব্রুয়ারির হামলায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরানের সরকারের পতনের আশা করেছিল। বরং তা নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্র খুলে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সাধারণত যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, সেটি ইরান ঘেঁষে অবস্থিত। এই প্রণালি এবং হুথি মিত্রদের হুমকির মুখে থাকা বাব আল-মান্দেবের মাধ্যমে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের অংশীদারদের ওপর এখন অর্থনৈতিক চাপ রাখার সক্ষমতা তেহরানের হাতে।
তেহরানের উদ্দেশ্য যা-ই হোক, অর্থনৈতিক ক্ষতি সমান হয়নি। জরুরি মজুত, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড তেল উৎপাদন এবং নরওয়ের মতো দেশের সরবরাহের কারণে পশ্চিমারা এখন পর্যন্ত ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের মতো বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে, যখন মার্কিন চালকদের পেট্রলের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। যদিও বর্তমান ব্যাঘাত আরও বড় আকারের। এপ্রিলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে সামান্য কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে।
বিপরীতে উপসাগরীয় রফতানিকারকদের অবস্থা অনেক খারাপ। একই মূল্যায়নে সৌদি আরবের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। কাতারের ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বদলে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ সংকোচনে নামানো হয়েছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, কৌতূহলের বিষয় হলো, নানাভাবে উপসাগরীয় তেলের প্রতি পশ্চিমের নির্ভরতা কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইসরায়েল আরও বেশি বোঝা হয়ে উঠেছে। তেলসমৃদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কেন্দ্রস্থল অঞ্চলে ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান দীর্ঘদিন দুই দেশের কূটনৈতিক জোটের ভিত্তি ছিল, সেটির কথাই তিনি বলছিলেন।
সূত্র: আল জাজিরা