ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিরল এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। দেশটির একজন ইহুদি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও স্বঘোষিত জায়নবাদী নেতা যোগ দিচ্ছেন আরব নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল রা’আমে। দলটির হয়ে শিগগিরই পার্লামেন্ট নেসেটে বসতে যাচ্ছেন ইয়োভ সেগালোভিটজ। মঙ্গলবারের নির্বাচনে আটটি আসন পেয়েছে দলটি।
মধ্যপন্থি ইহুদি নেতৃত্বাধীন একটি দল ছেড়ে রক্ষণশীল আরব নেতৃত্বাধীন দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইসরায়েলে ব্যাপক কৌতূহল ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের একটু ঝুলন্ত নির্বাচনের পর দেশটির রাজনীতিতে এখন বড় প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে অন্য বিরোধী দলগুলো জোট বাঁধবে কি না।
ইয়োভ সেগালোভিটজ জানান, রা’আম নেতা মানসুর আব্বাসের সঙ্গে তার এই রাজনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্দেশ্য হলো, জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন পেরিয়ে ইহুদি ও আরবরা যে রাজনৈতিক জোট গঠন করতে পারে, তা দেখানো।
নির্বাচনের আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি আরব, আমি ইহুদি। আমি ধর্মনিরপেক্ষ, তিনি ধর্মপ্রাণ। কিন্তু আমরা সবাই ইসরায়েলের নাগরিক। আমরা সবাই এই সমাজের অংশ। এখানে অগ্রগতি চাইলে আমাদের একসঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগোতে হবে’।
একটি ছোট দলকে বৃহত্তর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এনে দেওয়ার লক্ষ্যে এই জোট গঠন করা হলেও সেগালোভিটজের বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। ইসরায়েলের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে নেসেটে আরও তিনটি আসন পাওয়ার সাফল্য উদযাপন করছিল রা’আম। দলের সেই আয়োজনে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়া একমাত্র রাজনীতিক ছিলেন সেগালোভিটজ, যিনি আরবিতে কথা বলেননি। তবে এতে উপস্থিত কারও আপত্তি দেখা যায়নি। বরং তার বক্তব্যে হলজুড়ে করতালি ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘কুলানু ইসরায়েলিম!’ যার হিব্রু অর্থ, ‘আমরা সবাই ইসরায়েলি’।
তবে এই রাজনৈতিক সমঝোতার সঙ্গে সবাই একমত নন। ডানপন্থি সমালোচকেরা সেগালোভিটজের এই পদক্ষেপকে ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে আরও বামপন্থি আরব নেতৃত্বাধীন দল জয়েন্ট লিস্টের কয়েকজন নেতা এই উদ্যোগকে কেবল রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরির প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, মূলধারার দলগুলোর মন জয় করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আরব জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধানে নয়।
তবে সেগালোভিটজ ও আব্বাস দুজনই বলছেন, তাদের এই রাজনৈতিক ঐক্য ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছে। একই সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রা’আমের অবস্থানও শক্তিশালী করছে।
তবে এতে নেতানিয়াহু ও তার মিত্রদের সমালোচনা থামেনি। নির্বাচনের আগে, চলাকালে এবং পরেও রা’আমকে আক্রমণ করেছেন তারা। নেতানিয়াহুর দলও রা’আমের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাতিল চেয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে ছিল। নির্বাচনি প্রচারে ‘রাইট অর প্যালেস্টাইন’ স্লোগান ব্যবহার করেন নেতানিয়াহু। হিব্রু ভাষায় ছন্দময় এই স্লোগানের মাধ্যমে তিনি বারবার সতর্ক করেন, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আব্বাসের সঙ্গে জোট বাঁধবেন।
প্রসঙ্গত ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো এবার রেকর্ড ১৮টি আসন পেয়েছে। ফলে পরবর্তী সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ক্ষেত্রে এসব দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ জন্য ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোকে তাদের সঙ্গে জোট গড়তে রাজি হতে হবে।
সূত্র: এপি