জীবনের অধিকাংশ গ্রীষ্মই স্কটল্যান্ডের বালমোরালে কাটিয়েছেন ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সিংহাসনে থাকা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। স্কটল্যান্ডের উত্তরে এবারডিনশায়ারে নিজের এই এস্টেট ছিল রানির খুব পছন্দের জায়গা। ১৮৫২ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার সময় ব্রিটিশ রাজপরিবার এই সম্পত্তি কিনেছিল। এই প্রাসাদে রানি খুব ভালো সময় কাটাতেন বলে জানাচ্ছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো।
টাইম ম্যাগাজিনকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জীবনী ‘দ্য লাস্ট কুইন’-এর লেখক ক্লাইভ আরভিং বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন রানি হয়তো তার জীবনের শেষ সময়গুলো স্কটল্যান্ডেই থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি আরও জানান, উইন্ডসর ক্যাসল বা বাকিংহ্যাম প্যালেসের তুলনায় প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা বালমোরালের প্রাসাদটিকেই নিজের বাড়ি ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন রানি।
এবারডিনশায়ারে ৫০ হাজার একরের এস্টেটে স্বামী প্রিন্স ফিলিপকে নিয়ে অনেক অবকাশযাপন করেছেন রানি এলিজাবেথ। এখানে তিনি প্রায়ই আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। রাজপরিবারের সদস্যরাও আসতেন সেসব অনুষ্ঠানে।
প্রিন্স ফিলিপও তার জীবনের শেষ কয়েকটি বছর বালমোরালে কাটিয়ে গেছেন। ২০২০ সালে এখানেই তারা বিয়ের ৭৩তম বার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদযাপন করেন। বালমোরালের প্রাসাদটি ছিল মূলত রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স আলবার্টের। পরে রাজপরিবার এর পাশে আরও সম্পত্তি কিনে এস্টেট বড় করে। ১৮৫৬ সালে নতুন প্রাসাদ নির্মাণ করে আগেরটি ভেঙে ফেলা হয়।
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট দুর্ঘটনায় প্রিন্সেস ডায়ানা যেদিন মারা যান, সেদিন বালমোরাল প্রাসাদে বসে সেই খবর পান রাজপরিবারের সদস্যরা।
চলতি বছরের শুরু থেকেই রাজ কর্মচারীরা সফর ও রাজকার্যে রানির অংশগ্রহণ অনেকটাই কমিয়ে এনেছিলেন। রানির শারীরিক দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে তারা এটি করছিলেন। তবে গত মঙ্গলবার প্রোটোকল ভেঙে বালমোরাল প্রাসাদে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া লিজ ট্রাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ৭০ বছরের রাজশাসনে এর আগে নিয়োগ পাওয়া সব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাকিংহ্যাম প্যালেসে তিনি দেখা করেছেন। এবারই কেবল ব্যতিক্রম ঘটলো।
লিজ ট্রাসের সঙ্গে সাক্ষাতের ছবিতে রানিকে কিছুটা ক্লান্ত ও দুর্বল দেখাচ্ছিল। এরপর থেকেই মূলত রানির স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্য জানার চেষ্টা শুরু করে সংবাদমাধ্যমগুলো।
‘লন্ডন ব্রিজ ডাউন’ থেকে ‘অপারেশন ইউনিকর্ন’
রানির মৃত্যুর পর খবর সবাইকে জানানো, শেষকৃত্য, শোক পালনসহ পুরো বিষয়টি কীভাবে হবে তার পরিকল্পনা আগেই করে রাখা ছিল। এটি ‘অপারেশন লন্ডন ব্রিজ’ নামে পরিচিত। তবে বিশেষ করে স্কটল্যান্ডে রানির মৃত্যু হলে শেষকৃত্যসহ অন্যান্য অচার-অনুষ্ঠান কীভাবে সম্পন্ন হবে তার পরিকল্পনাও নেওয়া হয় এবং প্রক্রিয়াটির নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ইউনিকর্ন’। ইউনিকর্ন হচ্ছে একটি কাল্পনিক প্রাণী, যা স্কটল্যান্ডের জাতীয় প্রতীক। যুক্তরাজ্যের জাতীয় প্রতীক সিংহের পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ইউনিকর্ন প্রতীকেরও ব্যবহার রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বালমোরালে রানির মৃত্যুর পর অপারেশন লন্ডন ব্রিজ পাল্টে যায়, হয়ে যায় অপারেশন ইউনিকর্ন।
দ্য হেরাল্ড পত্রিকা জানায়, ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো এডিনবরার পার্লামেন্টের কাগজপত্রে ‘অপারেশন ইউনিকর্ন’ কথাটি উঠে আসে। বালমোরালে রানির মৃত্যু হলে যে বিশাল জনসমুদ্রের সৃষ্টি হবে তা সামলানোর চিন্তা থেকে এই নামটি ব্যবহার করা হয়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম জানাচ্ছে, স্কটল্যান্ডে রানির মৃত্যুর কারণে শেষকৃত্য প্রক্রিয়া কিছুটা জটিল হলো। রানির দেহ বালমোরাল থেকে হলিরুড হাউজে নিতে হবে। হলিরুড হাউজ হলো স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায় রানির সরকারি বাসভবন। সেখান থেকে আচার-অনুষ্ঠানের জন্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে মরদেহ নেওয়া হবে রয়্যাল মাইলে সেন্ট গাইলস ক্যাথেড্রালে। পরে এডিনবরার ওয়েভারলি স্টেশন থেকে একটি রয়্যাল ট্রেনে করে রানির মরদেহ লন্ডনে নেওয়া হবে। প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে আসা মানুষের ভিড় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, রানির উদ্দেশে নিয়ে আসা বা ছুড়ে দেওয়া ফুলসহ অন্যান্য সামগ্রী কুড়াতে রয়্যাল ট্রেনের পেছনে একটি লোকোমোটিভ ট্রেন থাকবে।
ট্রেনযাত্রা সম্ভব না হলে বিমানে করে কফিন লন্ডন নেওয়া হবে। পরে বাকিংহাম প্যালেসে বাকি আনুষ্ঠানিকতা হবে। মৃত্যুর ১০ দিন পর ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। অবশেষে উইন্ডসর ক্যাসেল প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হবে।
ইংল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক পাল্টে যাবে স্কটল্যান্ডের?
স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হলেও কার্যত এটি পরিচালিত হয় ভিন্ন ব্যবস্থায়। ইংল্যান্ড থেকে স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন হয়ে যাওয়ার ইস্যুটিও বেশ চর্চিত। আইনগতভাবেও স্কটল্যান্ড ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে কম সম্পৃক্ত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত ও বিভিন্ন জরিপের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ মিডিয়া বলছে, রানির মৃত্যুর পর দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে পারে। স্কটল্যান্ডের মাটিতে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যু স্কটিশ জনগণের আবেগকে নাড়া দিয়েছে সত্যি। রানি হিসেবে তিনি তার ভূমিকা ঠিকমতো পালন করেছেন এমনটা তারা মনে করেন। তবে রানির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্কটল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজত্বের সমাপ্তি চান তারা। ব্যক্তিগতভাবে রানি এলিজাবেথ যতটা জনপ্রিয়, তার ছেলে চার্লস ততটা জনপ্রিয় নন।
এদিকে স্কটল্যান্ডের ক্ষমতায় আছে কট্টর জাতীয়তাবাদী দল স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি)। তারা একটি স্বাধীন সার্বভৌম স্কটল্যান্ডের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে জনমত গঠন করছে। এসএনপি’র নেতা নিকোলো স্টারজেন তো বলেই দিয়েছেন, ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার ইস্যুতে ২০২৪ সালে গণভোট আয়োজন করা উচিত। তবে লিজ ট্রাস ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি সর্বশক্তিতে এই গণভোট প্রতিহত করবেন।