শ্বেতাঙ্গদের পেছনে ফেলে ব্রিটেনে শীর্ষে বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম

কয়েক দশকের বঞ্চনা, প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যের ইতিহাস পেছনে ফেলে যুক্তরাজ্যে অভাবনীয় সামাজিক রূপান্তর ঘটিয়েছেন তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা। শিক্ষা ও সম্মানজনক পেশায় দেশটির শ্বেতাঙ্গ সমবয়সীদের ছাড়িয়ে জাতীয় পরিসংখ্যানে রীতিমতো আলোড়ন তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া এই নতুন প্রজন্ম।

আদমশুমারি ও শিক্ষাসংক্রান্ত সাম্প্রতিক নথির বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিবাসী হিসেবে আসা প্রথম প্রজন্মের প্রাথমিক সংগ্রামের কারণে সামগ্রিক পরিসংখ্যানে এখনও কিছুটা পিছিয়ে থাকার চিত্র দেখা যায়। তবে তরুণ প্রজন্মটি দ্রুত দেশটির উচ্চবিত্ত ও সম্মানজনক মধ্যবিত্ত পেশায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বর্তমানে বসবাসরত প্রায় সাড়ে ছয় লাখ বাংলাদেশির মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম। ঐতিহাসিকভাবে এই জনগোষ্ঠীকে যুক্তরাজ্যে টিকে থাকতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ১৯৮৭ সালে স্পিটালফিল্ডস পরিদর্শসের সময় বর্তমান রাজা (তৎকালীন যুবরাজ) চার্লস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এখানকার বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রার মান ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে অনগ্রসর এলাকার মতোই শোচনীয়। এমন পরিস্থিতি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি। 

কমিশনের তৎকালীন প্রতিবেদনগুলো উচ্চ বেকারত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য দিয়েছিল। পাশাপাশি ১৯৮৫ সালের এক সরকারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রামীণ পটভূমি, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষকদের অনীহা এবং বর্ণবাদী আচরণের আশঙ্কায় বাংলাদেশি শিশুদের শিক্ষার মান ছিল উদ্বেগজনক।

তবে ব্রিটিশ-বংশোদ্ভূত তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে চিত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ২০১০ সালের পর থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষায় (জিসিএসই) ব্রিটিশদের কাছাকাছি পর্যায়ে যায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এবং খুব দ্রুতই তাদের ছাড়িয়ে যায়। তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে জিসিএসইতে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের রেকর্ড ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৮ শতাংশ।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, সাধারণ ডিগ্রির চেয়েও প্রকৌশল, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও দন্তচিকিৎসার মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো বেছে নিচ্ছেন এই তরুণরা। গত এক দশকে এসব পেশাদার শিক্ষায় তাদের অন্তর্ভুক্তি দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার এই চমকপ্রদ অগ্রযাত্রার প্রভাব পড়ছে সরাসরি কর্মক্ষেত্র ও আয়ে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।

শুরুতে পরিবারগুলোতে নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে অনীহা থাকলেও নতুন প্রজন্মের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২১ সালের আদমশুমারির হিসাবে, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারীদের ৬৮ শতাংশই এখন সরাসরি কর্মজীবী, যা ব্রিটিশ নারীদের প্রায় সমান। অথচ একই বয়সী প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩২ শতাংশ।

ব্যবস্থাপনা ও পেশাগত ক্ষেত্রেও শ্বেতাঙ্গ তরুণদের সমকক্ষ হয়ে উঠেছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৪ শতাংশই এখন বিভিন্ন করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চপদে কর্মরত। একই সঙ্গে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের পর থেকে দেশটির মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। 

এ ব্যাপারে সাংবাদিক ও লেখক মাহবুবুল করীম সুয়েদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, লন্ডনের গতিশীল অর্থনীতি ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মেধার মাধ্যমে ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা নিজেদের জীবনমান উন্নত করছেন। একই সঙ্গে দেশটির সামগ্রিক আর্থসামাজিক দৃশ্যপটেও তারা বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনছেন।